বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম তার নেতৃত্বে পরিচালিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে প্রমাণ মিলেছে। তদন্তে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের সহায়তার নামে প্রতিষ্ঠিত এনজিওগুলো ব্যবহার করে এই অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থকে বৈধ দেখানোর জন্য মনিরুল ইসলাম তার পরিবার, শ্যালক ও নিকটাত্মীয়দের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিন্ডিকেটের এই কর্মকাণ্ডে তার স্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা, শ্যালক রেজাউল আলম শাহীন, শ্যালকের স্ত্রী সানজিদা খানম টুম্পাসহ অন্যান্য ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দেরও জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
একসময়ের প্রভাবশালী অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধানে ইতোমধ্যেই মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের গোয়েন্দা অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মনিরুল ইসলামের বিগত দশ বছরে তার দ্রুত উত্থান এবং অভিযোগগুলোর যথাযথতা প্রমাণিত হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা, শ্যালক রেজাউল আলম শাহীন, শ্যালিকা সাদিয়া, শাহিনের স্ত্রী সানজিদা খানম টুম্পা এবং টুম্পার ভাই দেলোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্টদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্তে দেখা গেছে, কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামের দুটি এনজিও’র অনুদান দেখিয়ে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। শুধু এনজিও নয়, ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হিসাবেও হাজার হাজার কোটি টাকা জমা হয়েছে। এই অর্থ এসেছে দুই দিকে—এক দিকে বিদেশি দাতাদের অনুদান, অন্য দিকে শ্যালক-শ্যালিকা ও ঘনিষ্ঠজনদের বিভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তরিত। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এক বিশাল লুটপাটের চিত্র উপস্থাপন করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে মনিরুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী সায়লা ফারজানা বিধিবহির্ভূতভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন। সেই টাকা মনিরুলের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীন, এস এস এন্টারপ্রাইজ, তানভীর ডেইরি ফার্মসহ বিভিন্ন নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তরিত করে আত্মসাৎ এবং মানিলন্ডারিং আইনে অপরাধ করেছেন।
অপরদিকে, সন্দেহজনক এনজিও প্রতিষ্ঠান কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ (কেএসআর) ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব থেকে এস এস এন্টারপ্রাইজের হিসাবের মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ জমা ও উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নথিপত্রসহ অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, “অনুসন্ধান চলমান অবস্থায় অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে মন্তব্য করা যায় না। অনুসন্ধান কর্মকর্তা তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন জমা দিলে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) প্রধান মনিরুল ইসলামের নামে আটটি ব্যাংক হিসাব পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি এসব লেনদেন শ্যালক রেজাউল আলম শাহিনের মাধ্যমে করতেন।
মনিরুল ইসলাম কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামের দুটি এনজিও নিয়ন্ত্রণ করতেন। গত সাত বছরে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এই দুটি এনজিও রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ও পুনর্বাসনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা অনুদান এনেছে। এস এস এন্টারপ্রাইজের হিসাবের লেনদেন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মাধ্যমে এই অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাবেক এসবি প্রধানের স্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা, ২০২৪ সালে ঢাকা ব্যাংক পিএলসির বৈদেশিক বাণিজ্য শাখায় তার ভাইয়ের কমার্শিয়াল ব্যাংক হিসাব থেকে দুই দফায় ১৫ লাখ ও ২০ লাখ টাকা জমা করেছেন। তিনি লিখিতভাবে দাবি করেছেন, এই অর্থ তার ছেলে অনন্য ইসলামের ইংল্যান্ডে পড়াশোনার ভিসা সুবিধার্থে জমা করা হয়েছিল। তদন্তে আরও জানা গেছে, মনিরুল ইসলাম রাজধানীর মিরপুর ও উত্তরায় ৫০টির বেশি ফ্ল্যাট কিনেছেন, যা তার স্ত্রী ও শ্যালকের নামে আছে।
মনিরুল ইসলামের শ্যালকের স্ত্রী সানজিদা খানম টুম্পার নামে ২০২০ সালে কমিউনিটি ব্যাংক পিএলসির হিসাবেও ১১.৭০ কোটি টাকা জমা হয়। প্রায় সমপরিমাণ অর্থ একই সময়ে উত্তোলনও করা হয়। একজন গৃহিণীর হিসাব হিসেবে স্বল্প সময়ে ২৩.৫০ লাখ টাকার চারটি ডিপিএস এবং ৬.২১ কোটি টাকার তিনটি এফডিআর থাকা অস্বাভাবিক বলে তদন্তকারীরা মনে করেছেন। টুম্পার বিভিন্ন লেনদেনের মধ্যে রয়েছে— ২০২০ সালের জুনে তার নামে সাউথইস্ট ব্যাংকের মিরপুর শাখায় ১.১৫ কোটি টাকা জমা হয়। এই অর্থ এস এস এন্টারপ্রাইজের নামে পরিচালিত কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের হিসাব থেকে এসেছে। ২৮ জুন ওই বছরের কমিউনিটি ব্যাংকের হিসাবের মাধ্যমে ছয়টি লেনদেনের মাধ্যমে ১.৩৬ কোটি টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে।
তাছাড়া, একই মাসে কমিউনিটি ব্যাংকে টুম্পার হিসাবের মধ্যে মনিরুল ইসলামের স্ত্রী সায়লা ফারজানার বোন সাদিয়া আহম্মেদের হিসাব থেকে ৫৭ লাখ টাকা জমা হয়। এই টাকা মিলিয়ে টুম্পার কমিউনিটি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে দুই কোটি টাকা স্থায়ীভাবে জমা হয়। এরপর ২০২২ সালে টুম্পার নামের ওই হিসাব থেকে ঢাকা ব্যাংক থেকে ৪৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, শাহিনের বোন সাদিয়ার হিসাব থেকে ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা এবং সাউথইস্ট ব্যাংক হিসাব থেকে ৬৩ লাখ ৫১ হাজার টাকা জমা হয়। সব অর্থ উত্তোলন করে দুই কোটি টাকার এফডিআর করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে মনিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী সায়লা ফারজানা বিধিবহির্ভূতভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন। সেই টাকা শ্যালক রেজাউল আলম শাহীন, এস এস এন্টারপ্রাইজ, তানভীর ডেইরি ফার্মসহ বিভিন্ন নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ এবং মানিলন্ডারিং আইনে অপরাধ করেছেন।
২০২৪ সালের বিভিন্ন সময়ে সানজিদা খানম টুম্পার নামে ঢাকা ব্যাংকের হিসাবের মাধ্যমে এফডিআর নগদায়নের মাধ্যমে ৭৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা জমা হয়। ওই অর্থ থেকে ৭৫ লাখ টাকা টুম্পার ভাই দেলোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান উপমা ইন্টারন্যাশনালের হিসাবেও স্থানান্তরিত হয়েছে।
মনিরুল ইসলামের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীনের ব্যাংক হিসাবেও কোটি কোটি টাকার লেনদেন ধরা পড়েছে। তার নামে কমিউনিটি ব্যাংক, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ১১টি হিসাব পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনে দুটি এফডিআরসহ প্রায় সাত কোটি টাকা মিলেছে। এছাড়া তার অন্য হিসাবের মধ্যে ঋণের দুই কোটি টাকা পাওয়া গেছে, যা জনৈক মো. গোলাম কিবরিয়ার নামে ইস্যু করা হয়েছে এবং দেড় কোটি টাকায় জমি ক্রয়ের তথ্যও মিলেছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তার প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস এস এন্টারপ্রাইজের হিসাবের মাধ্যমে তিন কোটি ২১ লাখ টাকার সন্দেহভাজন লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। সার্বিকভাবে শাহীনের হিসাবের গতি-প্রকৃতি দেখে অর্থ লুকানো বা লেয়ারিং করার চেষ্টা প্রমাণিত হচ্ছে।
মেসার্স এস এস এন্টারপ্রাইজের নামে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের মিরপুর শাখার হিসাবটি ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর খোলা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ২৮৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা জমা এবং ২৮৫ কোটি ৮ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই মনিরুল ইসলামের নামে পরিচালিত সিটি ব্যাংকের হিসাব থেকে ৫০ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। ওই হিসাবের মধ্যে ১.৩৪ কোটি টাকার সরকারি চেক এবং তিন কোটি টাকা নগদ জমা হওয়ার নজিরও রয়েছে।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানিয়েছেন, “অনুসন্ধান চলমান অবস্থায় অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে মন্তব্য করা যায় না। অনুসন্ধান কর্মকর্তা তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন জমা দিলে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।” অন্যদিকে, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসির কক্সবাজার শাখার গ্রাহক বিসমিল্লাহ কনস্ট্রাকশন এন্ড সাপ্লাইয়ার্স লিমিটেডের মালিক মোজাম্মেল হকের নামে পরিচালিত হিসাব থেকে ২০১৯ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এস এস এন্টারপ্রাইজের হিসাব হয়ে উত্তোলন করা হয়েছে।
এস এস এন্টারপ্রাইজের অন্য একটি কমার্শিয়াল ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করা হলে দেখা যায়, ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাবের মধ্যে ২.২৫ কোটি টাকা নগদ জমা, ৫৭.০২ কোটি টাকা এনজিও’র হিসাব থেকে জমা, ১৫.৮৬ কোটি টাকা নগদ উত্তোলন এবং ৩৬.৩১ কোটি টাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে স্থানান্তর করা হয়েছে। অর্থ জমাকারীর মধ্যে তানভীর আহম্মেদ, সোহাগ হোসেন, শরীফুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমানের নাম পাওয়া গেছে।
সানজিদা খানম টুম্পার ভাই এবং উপমা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেনের নামে প্রায় ৩২টি ব্যাংক হিসাব পাওয়া গেছে। এতে চলতি হিসাব, ঋণ হিসাব ও স্থায়ী আমানত হিসাবসহ মোট ২৮ কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য মিলেছে। ওই হিসাবগুলোতে শাহীন, টুম্পা, দেলোয়ার, এস এস এন্টারপ্রাইজ ও উপমা ইন্টারন্যাশনালের নামে লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে।
কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ নামের প্রতিষ্ঠানটির নামে ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের উত্তরা শাখায় হিসাব খোলা হয়। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. গাজী মো. জহিরুল ও প্রজেক্ট ইনচার্জ এ কে এম রফিকুল হক হিসাব পরিচালনা করেন। এই হিসাবের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা এবং ৮৬৭ কোটি ৯ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে হিসাবের স্থিতি দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা।
হিসাবের নমুনা ভিত্তিতে সংগৃহীত ভাউচার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ড্রিম স্ট্রাকচার, মেসার্স এস এস এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স গোলাম রব্বানী এন্ড কন্ট্রাক্টর, সাজা ট্রেডিং, সাদি এন্টারপ্রাইজ, রেক্সনা ট্রেডিং কর্পোরেশন এবং ডি ডি বিল্ডার্সের হিসাবের মধ্যে ছোট ছোট কিন্তু বারবার অর্থ প্রেরণের নজির রয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কেএসআর ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল থেকে এস এস এন্টারপ্রাইজের একটি হিসাবের মধ্যে প্রায় ১৩ কোটি টাকা এবং আরেকটি হিসাবের মধ্যে ২৩ কোটি টাকা জমা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনালের অনুদানের পুরো অর্থ মনিরুল ইসলামের সহায়তায় লুটপাট করা হয়েছে।

