টানা তিন অর্থবছর পতনের পর চলতি অর্থবছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কিছুটা বাড়তে শুরু করেছিল। তবে সেই ধারাবাহিকতা ফেব্রুয়ারিতে এসে ভেঙে যায়। সর্বশেষ তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র বিক্রির তুলনায় পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়ায় নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৫৫৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, সরকার এই খাত থেকে নতুন করে অর্থ সংগ্রহের বদলে বরং বেশি পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের পরিবর্তন। সঞ্চয়পত্রের তুলনায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বেশি সুবিধা থাকায় বিনিয়োগকারীরা সেদিকে ঝুঁকছেন।
তথ্য অনুযায়ী, একক মাস হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে নিট বিক্রি কমেছে এক হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। জানুয়ারিতেও একই ধারা ছিল, যেখানে নিট বিক্রি কমেছিল এক হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তবে আগের কয়েক মাসে তুলনামূলক বেশি বিক্রির কারণে জানুয়ারি পর্যন্ত মোট নিট বিক্রি ইতিবাচক অবস্থানে ছিল, যা দাঁড়িয়েছিল ৬১০ কোটি টাকা। আরও আগে, ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে এই পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৪৬১ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদের হার ও অন্যান্য সুবিধার কারণে ট্রেজারি বিল ও বন্ড এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সঞ্চয়পত্রে একজন বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারেন, কিন্তু বিল ও বন্ডের ক্ষেত্রে এমন কোনো সীমা নেই। পাশাপাশি এসব বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর কর দিতে হয় না।
অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ট্রেজারি বিলের মতো স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগে, যেমন ৯১ দিন মেয়াদি বিলে, প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যাচ্ছে। কিছু সময় আগে সরকারের ঋণ চাহিদা কম থাকায় বিল ও বন্ডের সুদহার কমে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সুদের হারও আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ফলে সব দিক বিবেচনায় সঞ্চয়পত্রের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
প্রতি বছর বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও গত অর্থবছরে ১৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে ঋণ ছিল ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা।
এদিকে, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও মার্চ পর্যন্ত, অর্থাৎ তিন মাস বাকি থাকতেই, সরকার ইতোমধ্যে এক লাখ ছয় হাজার ৫১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৯৯ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।
সরকারি ঋণ বাড়লেও এর প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতে। ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে।

