বিশ্বজুড়ে কাজের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশন প্রযুক্তি। শিল্প, সেবা এবং উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই মানুষের বদলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা জায়গা করে নিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ঢেউ বাংলাদেশেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় অংশ কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তৈরি পোশাক ও ফ্রিল্যান্সিং খাতকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এসব খাতে রুটিনভিত্তিক কাজ দ্রুত অটোমেশনের আওতায় চলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এআই প্রস্তুতির দিক থেকে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ভারতের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এআই ব্যবহারের সক্ষমতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার নিচের সারিতে অবস্থান করছে। দক্ষ জনবলের ঘাটতি, দুর্বল ডিজিটাল অবকাঠামো এবং অপর্যাপ্ত ইন্টারনেট সংযোগকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এআই সম্পর্কিত দক্ষতার চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো প্রযুক্তি তৈরি ও গ্রহণের সক্ষমতায় প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর ফলে দেশের বিশাল তরুণ কর্মশক্তি ভবিষ্যতে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এআইয়ের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক ধরনের পরীক্ষা। সঠিক নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এআই হুমকি না হয়ে বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিক ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম বলেও উল্লেখ করা হয়। কারণ এখানকার বড় অংশ মানুষ কম দক্ষ এবং কৃষি ও হাতে-কলমে কাজের সঙ্গে যুক্ত। তবুও প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমান হবে না।
বিশেষ করে মাঝারি শিক্ষিত তরুণ কর্মীরা, যারা রুটিনধর্মী অফিস বা হালকা জ্ঞানভিত্তিক কাজে যুক্ত, তারা এআই-চালিত অটোমেশনের কারণে চাকরি হারানোর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইউনেসকো এবং ইউএনডিপির সহায়তায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো এআই ব্যবহারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই ও অটোমেশনের কারণে নারীকর্মীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে আছেন। ইউনেসকোর বাংলাদেশবিষয়ক এআই র্যাম রিপোর্টে বলা হয়, এআই ও অটোমেশনের প্রভাবে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মশক্তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তি প্রায় ৭ কোটি ৩৭ লাখ।
ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে অটোমেশন নতুন বিষয় নয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে আধুনিক মেশিন ব্যবহার হচ্ছে। তবে এখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ক্রেতারা এখন উচ্চমানের ও টেকসই পণ্য চান। পাশাপাশি দ্রুত উৎপাদনের চাপও বাড়ছে। ফলে শুধু মেশিন নয়, এখন দরকার এআইনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা।
দেশের কিছু আধুনিক কারখানায় ইতিমধ্যে এআই ব্যবহার করে কাপড়ের ত্রুটি শনাক্ত করা হচ্ছে। মেশিন নষ্ট হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ত্রুটির পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে অপচয় কমছে এবং পণ্যের মান বাড়ছে। নতুন ডিজাইন তৈরিতেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফ্যাশনের ট্রেন্ড, আগের অর্ডার এবং ক্রেতার চাহিদা বিশ্লেষণ করে দ্রুত নতুন ডিজাইন তৈরি করা হচ্ছে। এতে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি বাজারের সঙ্গে তাল মেলানো সহজ হচ্ছে। অন্যদিকে রোবোটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার বাড়ায় প্রচলিত শ্রমনির্ভর কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও এআই বিশেষজ্ঞ ড. কে এম আশিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে এআই ও অটোমেশনের ব্যবহার এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। তার মতে, দেশে শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলক কম হওয়ায় এই প্রযুক্তির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে সময়ের সঙ্গে এর ব্যবহার বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, উন্নত দেশে শ্রমিক ব্যয় বেশি হওয়ায় সেখানে এআই ও অটোমেশন দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো কিছু প্রযুক্তি ইতিমধ্যে এসেছে, তবে সেগুলো ব্যয়বহুল। তাই সস্তা শ্রমনির্ভর বাজারে এই প্রযুক্তি কতটা লাভজনক হবে, তা ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে।
দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি কর্মসংস্থান খাত পোশাক শিল্প। তবে এই খাতে নতুন নিয়োগ এখন প্রায় স্থবির। কারণ, আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে কম জনবল দিয়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। একই প্রবণতা কৃষি ও ব্যাংকিং খাতেও দেখা যাচ্ছে, যেখানে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রস্তুতির ঘাটতিও রয়েছে।
বিজিএমইএর পরিচালক ও কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ বলেন, প্রযুক্তিগত দক্ষতায় পিছিয়ে থাকায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ভিয়েতনামের মতো দেশের কাছে বাজার হারাচ্ছে।
তার মতে, ভিয়েতনাম নিয়মিত আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, সফটওয়্যার, ডেটা ব্যবহার এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিনিয়োগ করছে। এতে তাদের উৎপাদন খরচ কমছে এবং গুণগত মান বাড়ছে। তিনি জানান, অটোমেশনের কারণে তিনজনের কাজ এখন একজন কর্মী দিয়েই করা সম্ভব হচ্ছে। এতে অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ কমে যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ জনবলের চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বড় শিল্পগুলোতে খরচ কমানোর জন্য অটোমেশনের প্রবণতা বাড়ছে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এআই ও অটোমেশন বাধ্যতামূলক বাস্তবতা হয়ে উঠবে। তখন একদিকে যেমন কিছু কাজ হারানোর ঝুঁকি থাকবে, অন্যদিকে দক্ষ ও শিক্ষিত কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হবে।
এআই ও অটোমেশন এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকিও। দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের শ্রমবাজার কোন দিকে যাবে।

