ব্যাংক হিসাব খোলার সঙ্গে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেড লাইসেন্স থাকা কিন্তু ভ্যাট নিবন্ধনবিহীন বিপুলসংখ্যক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করের আওতায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, ভ্যাট নিবন্ধন বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি আগামী জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। নতুন চলতি হিসাব খোলার সময় কিংবা বিদ্যমান হিসাব সচল রাখতে বিআইএন যাচাই বাধ্যতামূলক করার চিন্তাভাবনা চলছে। এই নীতি কার্যকর হলে ছোট-বড় বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন নিতে বাধ্য হবে। মূল লক্ষ্য হলো ভ্যাটের পরিধি বাড়ানো এবং নিবন্ধনের বাইরে থাকা ব্যবসাগুলোকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান আইনে ভ্যাটের আওতায় আসার যোগ্য অনেক ব্যবসায়ী এখনো নিবন্ধন নেননি। তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যাংক হিসাব খোলার সময় নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অর্থমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে এটি আগামী বাজেটে যুক্ত হতে পারে এবং পরবর্তী অর্থবছর থেকেই কার্যকর হতে পারে। আরেক কর্মকর্তা জানান, শুধু নতুন হিসাব নয়, বিদ্যমান হিসাব চালু রাখতেও বিআইএন যাচাই বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ভ্যাট নিবন্ধনধারীর সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৯২ হাজার। এর মধ্যে নিয়মিত রিটার্ন জমা পড়ে প্রায় ৫ লাখের। অন্যদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে, ট্রেড লাইসেন্সধারী দোকানের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। এর বাইরে আরও বহু ব্যবসা ও সেবা প্রতিষ্ঠান এখনো ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে, যদিও সব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের চলতি হিসাব ব্যবহার করে না।
এনবিআরের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ছোট লেনদেনকারী ব্যবসায়ীরা এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য নয়। যাদের চলতি হিসাব রয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়, তাদের টার্নওভার তথ্য সংগ্রহ ও প্রযোজ্য ভ্যাট আদায়ের জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বিকল্প হিসেবে সেভিংস হিসাব ব্যবহার করে কেউ নজরদারি এড়াতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সেভিংস হিসাবের লেনদেনে সীমা থাকায় প্রয়োজন হলে সেদিকেও নজরদারি জোরদার করা সম্ভব।
প্রস্তাবটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু বলেন, ব্যাংক হিসাব খোলা বা পরিচালনায় বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংকমুখী হতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে তারা টাকা জমা রাখা বা আনুষ্ঠানিক লেনদেন থেকে সরে যেতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, ছোট ব্যবসায়ীদের জোর করে ভ্যাটের আওতায় আনলে তাদের ব্যয় বেড়ে যাবে, যা অনেককে ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য করতে পারে। ভ্যাট ব্যবস্থার জটিলতা ও হয়রানিও নিবন্ধনে অনীহার একটি বড় কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ব্যাংক খাত থেকেও একই ধরনের শঙ্কা এসেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংক চার্জ ও আবগারি শুল্কের চাপের কারণে মানুষ আগেই ব্যাংকে অর্থ রাখতে অনাগ্রহী। এর সঙ্গে নতুন করে বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যবসায়ীরা হিসাব খোলায় আরও অনাগ্রহী হতে পারেন এবং বিকল্প মাধ্যমে অর্থ সংরক্ষণ করতে পারেন। তিনি মনে করেন, রাজস্ব বাড়াতে হলে সরকারের উচিত প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

