মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমে আসায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা তৈরি হয়েছে। এই রুট দিয়েই দেশের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি হয়। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমেছে এবং আটকে থাকা তেলের চালান আবারও গন্তব্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী একটি ট্যাংকার, যা দীর্ঘদিন সৌদি বন্দরে আটকে ছিল, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ চেইনে গতি ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে সংঘাতের কারণে জ্বালানি আমদানি বিঘ্নিত হয়, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৬ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯২ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এই পরিস্থিতিতে দেশের একমাত্র অপরিশোধিত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের কার্যক্রম চালু রাখা সহজ হবে। কাঁচামালের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত কাটছে। নিয়মিত তেল সরবরাহ বজায় থাকলে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেলের উৎপাদনও স্থিতিশীল থাকবে।
তেলের দাম কমায় সরকারের ভর্তুকির চাপও কিছুটা হালকা হতে পারে। এর আগে উচ্চ দামের কারণে সরকারকে অতিরিক্ত বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই স্বস্তি কতদিন থাকবে তা নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির ওপর।
অন্যদিকে, এলএনজি খাতে তাৎক্ষণিক সুবিধা মিলবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও এর প্রভাব দেশে পৌঁছাতে সময় লাগবে। বিশেষ করে ‘ফোর্স মাজ্যুর’ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহে বিলম্ব এবং বেশি দামে কার্গো আমদানির ঝুঁকি রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির ফলে পরিবহন ও লজিস্টিক খাতেও চাপ কমতে শুরু করেছে। সংঘাত চলাকালে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিমা ও ফ্রেইট খরচ বেড়েছিল। এখন ধীরে ধীরে এসব ব্যয় কমার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যদিও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে।
ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, তবে সতর্কও রয়েছেন। তাদের মতে, স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে রপ্তানি খাত ও শিল্প উৎপাদন আরও গতি পাবে। একইসঙ্গে আমদানি ব্যয় কমলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিয়ে এলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল থাকে তার ওপর।

