সরকারের কাছে দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বকেয়া বিল এখন ৫০ হাজার কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়েছে। বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতার কারণে কোম্পানিভেদে ছয় থেকে ১৪ মাস পর্যন্ত অর্থ আটকে রয়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ খাতে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের আর্থিক চাপ, যা সামনে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি কেন্দ্র মিলিয়ে মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। মার্চ মাসের বিল যুক্ত হলে এই অঙ্ক আরও বাড়বে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বকেয়া অর্থ না পাওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করতে পারছে না। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের বোঝাও বেড়ে চলেছে। ফলে অনেক কোম্পানির পক্ষে নিয়মিত উৎপাদন বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বকেয়ার এই সংকটের সূচনা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। পরবর্তীতে তা আরও জটিল হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু অর্থ পরিশোধ হলেও গত বছরের জুলাই থেকে আবার বিল পরিশোধে অনিয়ম শুরু হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ বিভাগ অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই বিপুল বকেয়া গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে পিক সময়ে উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং লোডশেডিং বাড়তে পারে।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসের বিল হিসেবে আরও প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হবে। কিন্তু যে হারে বিল পরিশোধ হচ্ছে, তা দিয়ে ঋণ শোধ বা জ্বালানি আমদানি—দুটোই ঠিকমতো করা যাচ্ছে না।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ বাড়ার পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন কেন্দ্র যুক্ত হওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। তাই অতিরিক্ত আরও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা মাসিক ভর্তুকি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একটি শীর্ষ বেসরকারি কোম্পানির হিসাবে, তাদের গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রের বিপিডিবির কাছে বকেয়া প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। একইভাবে ইউনাইটেড গ্রুপের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। এসব বকেয়ার কারণে ব্যাংক থেকে নতুন এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঋণের চাপ বাড়ায় কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
ইউনাইটেড গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানান, বকেয়া না পাওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দিচ্ছে না। ফলে জ্বালানি আমদানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে দেশে গড়ে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট আসে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে। এসব কেন্দ্রের বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা ৮ থেকে ১০ মাসের সমপরিমাণ। এত বড় অঙ্কের বকেয়া নিয়ে কেন্দ্র চালু রাখা মালিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানিয়েছেন, বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা সম্ভব হবে না। বর্তমানে কেন্দ্রগুলোর হাতে সীমিত জ্বালানি মজুদ রয়েছে, যা দিয়ে দীর্ঘ সময় উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়। অর্থ ছাড় পেলেও নতুন করে জ্বালানি আমদানি করতে অন্তত মে মাসের মাঝামাঝি সময় লাগবে।
চলতি গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই চাহিদা মেটাতে কয়লা, তেল ও আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
এদিকে বকেয়া বিল পরিশোধের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এখনো সামনে আসেনি। বিপিডিবি জানিয়েছে, তারা ভর্তুকির ওপর নির্ভর করেই ধাপে ধাপে বিল পরিশোধের চেষ্টা করছে। তবে আদালতে চলমান কিছু মামলাও অর্থ পরিশোধে জটিলতা তৈরি করছে। এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলে বিশেষ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে আংশিক পরিশোধ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগও পুরো সমস্যা সমাধান করতে পারেনি।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতের এই বকেয়ার প্রভাব এখন ব্যাংক খাতেও পড়ছে। দীর্ঘদিন অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কঠিন হয়ে উঠছে। ব্যাংকারদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত অর্থ ছাড় না হলে আর্থিক খাতে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতসহ বিভিন্ন ভর্তুকির অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকিং খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। কিছু অর্থ ছাড় হলেও বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া এখনও বাড়ছে, যা উদ্বেগের বিষয়। সামগ্রিকভাবে, বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া বিলের এই সঙ্কট শুধু উৎপাদন নয়, জ্বালানি আমদানি, ব্যাংকিং খাত এবং সার্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। দ্রুত সমাধান না হলে গ্রীষ্মকালেই এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

