আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে শুধু ঋণ পরিশোধেই দেশকে ব্যয় করতে হবে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এই অঙ্ককে ঘিরেই নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক মহলে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই পরিমাণকে অত্যন্ত বড় বলে মনে করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫৪ বছরে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার। তুলনায় আগামী মাত্র পাঁচ বছরেই এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ ব্যয় করতে হবে।
সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা জাতীয় আয়ের প্রায় ১৯ শতাংশের সমান। বর্তমানে ঋণ ও সরকারি আয়ের অনুপাত ১৬.৫ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নির্ধারিত ঝুঁকিপূর্ণ সীমা ১৮ শতাংশের নিচে থাকলেও সামগ্রিক চিত্রকে পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক বলা যাচ্ছে না।
আরও দীর্ঘমেয়াদী চাপে আছে দেশটি। ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের মোট পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার। ২০৩০ সালে একক বছরেই সর্বোচ্চ প্রায় ৫৫০ কোটি ডলার পরিশোধের চাপ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। হিসাব অনুযায়ী, এই প্রবাসী আয়ের বড় অংশ দিয়েই নির্দিষ্ট সময়ে সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দিতে হতে পারে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পুরো বৈদেশিক ঋণ থেকে মুক্ত হতে বাংলাদেশের সময় লাগতে পারে প্রায় ৩৭ বছর, অর্থাৎ ২০৬৩ সাল পর্যন্ত।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ:
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঋণচাপের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে ইউক্রেন যুদ্ধ, কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং প্রবাসী আয়ে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে জ্বালানি আমদানি, রপ্তানি আয় এবং শ্রমবাজার সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান কমে গিয়ে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাও দুর্বল হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ কারণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন বিলম্ব। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার), কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেল সংযোগ এবং শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্পগুলো বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল।
এর মধ্যে অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ না হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি প্রত্যাশিত আয়ও বিলম্বিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাপানি অর্থায়নে নির্মিত প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এখনো চালু হয়নি। একইভাবে ২০২৮ সাল নাগাদ রূপপুর প্রকল্পের জন্য বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
রাজস্ব ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা:
অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো কর কাঠামো। বাংলাদেশে কর-জাতীয় আয়ের অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশ, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কম। ফলে সরকার ব্যয় নির্বাহে বারবার ঋণের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি মূলত অপ্রত্যক্ষ করনির্ভর হওয়ায় রাজস্ব সংগ্রহ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না। পাশাপাশি ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে শুল্ক ও কর রাজস্ব বৃদ্ধিও সীমিত রয়েছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও চাপ তৈরি হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দাতা সংস্থা ঋণের সুদের কাঠামো ও পরিশোধের সময়সীমা পরিবর্তন করেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ডও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়িয়েছে।
সম্ভাব্য উত্তরণের পথ: এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে একাধিক কাঠামোগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, কর রাজস্ব বৃদ্ধি এখন অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে কর-জাতীয় আয়ের অনুপাত উন্নত করা ছাড়া টেকসই অর্থনীতি সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একই সঙ্গে আমদানিকে যৌক্তিক করা, বিলাসপণ্য ও উৎপাদন উপকরণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা দরকার। প্রবাসী আয় বৃদ্ধির উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।
তৃতীয়ত, বড় প্রকল্প নির্বাচনে আরও কঠোরতা দরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়সীমা মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনীয় বড় প্রকল্প এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ঋণনির্ভর প্রকল্পের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই আরও শক্তিশালী করার তাগিদ রয়েছে।
চতুর্থত, রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি—এই চারটি ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে কখনো ডিফল্ট করেনি, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

