বাজেট ঘোষণার পর থেকেই দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আলোচনায় একটি প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি ঘুরে ফিরে আসছে—এত বড় ব্যয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজনীয় বিপুল রাজস্ব সরকার কীভাবে সংগ্রহ করবে? বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তবতায় এ ধরনের শঙ্কা অমূলক বলেও মনে করছেন না অনেকে।
প্রস্তাবিত বাজেটে একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে করের আওতা সম্প্রসারণ, বকেয়া রাজস্ব আদায় জোরদার করা এবং শুল্ক কাঠামো আরও কঠোর করার মতো বেশ কিছু কঠিন পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে শুল্ক ও করের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ছাড় এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌক্তিকীকরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এই দুই বিপরীতমুখী নীতির মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই বিশাল রাজস্ব চাহিদা পূরণে চাপ কোথায় সবচেয়ে বেশি পড়বে, কোন খাতে কী ধরনের স্বস্তি দেওয়া হবে, এবং কেবল কাগজে-কলমে নয় বরং বাস্তব অর্থনীতিতে এসব পরিকল্পনাকে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এ বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে বুঝতে বাজেট প্রস্তাবগুলোর গভীর ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
রাজস্ব প্রবাহ বাড়ানোর কৌশল: সংগ্রহ ব্যবস্থায় গতি ফেরানোর উদ্যোগ
চলতি বাজেটে অন্যান্য বছরের মতো সরাসরি করহার বাড়ানোর পথে না হেঁটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবার তুলনামূলক কৌশলগত পথে অগ্রসর হয়েছে। করের পরিধি বাড়ানো, উৎসে কর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করা, আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করা এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা থেকে রাজস্ব আহরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজস্ব সংগ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে এবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-এর সঙ্গে রাজস্ব প্রবাহের সরাসরি সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে অভ্যন্তরীণ কর ও ভ্যাটের মাধ্যমে অন্তত ৪৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এডিপি সাধারণত শতভাগ বাস্তবায়িত হয় না। এর ফলে বাস্তবায়নের ঘাটতি থেকে রাজস্ব প্রবাহও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায় না। পাশাপাশি সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটানোর চাপের কারণে অনেক সময় উন্নয়ন ব্যয় কাটছাঁটের দিকে যেতে হয়। এ কারণে এডিপি-নির্ভর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ভ্যাট বকেয়া আদায়ের উদ্যোগও বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯৯১ সালের পুরনো আইনের আওতায় ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জমে থাকা ভ্যাট বকেয়ার ওপর প্রতি মাসে ২ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করে আদায় কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কম ব্যয়বহুল করার উদ্যোগও রয়েছে। এই উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে আটকে থাকা রাজস্ব আয়ের একটি অংশ আদায় সম্ভব হলেও, সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এর সীমাবদ্ধতা থেকেই যাচ্ছে।
কাঠামোগত পরিবর্তন ও করের পরিধি সম্প্রসারণ:
চলতি বাজেটে করের নেটওয়ার্ক স্থায়ীভাবে বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়ে একাধিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
খুচরা খাতে নতুন কর কাঠামো:
খুচরা বাজারের বিশাল ও অনথিভুক্ত অংশকে কর জালের মধ্যে আনতে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বা প্রতি হাজারে ২ টাকা উৎসে কর (টিসিএস) আরোপ করা হয়েছে। এটি মূলত দেশের বড় অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধাপে ধাপে কর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্যক্তিপর্যায়ে প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থার পরিবর্তন:
ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্রে কর আদায়ের পরিধি ও কাঠামোতে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। চাকরিজীবীদের জন্য ৫ শতাংশের সর্বনিম্ন কর ধাপ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত কমানো এবং সঞ্চয়পত্রের সুদ আয়ের ওপর চূড়ান্ত কর সুবিধা প্রত্যাহার করায় আয়কর আদায় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চারের কর অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। স্বর্ণালংকার বিক্রির মুনাফাকে ব্যক্তিগত সম্পদের ছাড়ের আওতা থেকে বাদ দিয়ে মূলধনি মুনাফা করের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন থাকা বাধ্যতামূলক করায় আরও বেশি মানুষকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এসব পদক্ষেপের বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে করভীতি বেশি থাকায় এসব নিয়ম তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলে অংশগ্রহণ কমিয়ে দিতে পারে কি না, তা নিয়ে অর্থনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ব্যাংকিং খাতে সম্ভাব্য প্রভাবও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
অগ্রিম ও উৎসে করের বিস্তার:
করপোরেট লভ্যাংশের ওপর বিদ্যমান ছাড় প্রত্যাহারের ফলে এই খাত থেকে রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নগদ প্রণোদনা এবং স্থাবর সম্পত্তি বা রিয়েল এস্টেট বিক্রির ওপর আরোপিত মূলধনি করকে অগ্রিম কর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাসিন্দা এবং সেখানে কর্মরত চাকরিজীবীদের বেতন ও আয়ের ওপর কর আরোপের বিষয়টি এবার বাজেটে যুক্ত করা হয়েছে। অপ্রদর্শিত অর্থ বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘স্বেচ্ছায় আয় ঘোষণা’ সুবিধাও রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বজায় রেখে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। উপহার কর আদায় প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে ‘এ-চালান’ পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কর সংগ্রহ ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
শুল্ক বৃদ্ধি, সুনির্দিষ্ট ভ্যাট ও উৎসে করের বিস্তার:
চলতি বাজেটে পরোক্ষ কর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট, উৎসে কর এবং আমদানি শুল্ক—সব ক্ষেত্রেই নতুন করে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এমএস রডের মতো উচ্চ ব্যবহার্য শিল্পপণ্যের ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাটের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এর মাধ্যমে শিল্প খাত থেকে রাজস্ব প্রবাহ আরও স্থিতিশীল করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন অভিজাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবার ওপর উৎসে কর (টিডিএস) নতুনভাবে প্রবর্তন বা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্লাবের সদস্যপদ, খুচরা ব্যবসা, হেলিকপ্টার ভাড়া, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং জনশক্তি সরবরাহ সেবা।
দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে এক বিস্তৃত তালিকায় আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে বিলাসপণ্য যেমন ১২০০ সিসি থেকে ১৬০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ি, নিকোটিন পাউচ ও গ্র্যানুলস।
একই সঙ্গে কিছু শিল্প ও কৃষি উপকরণের ওপরও শুল্ক সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফিশ ফিলেট, কাজুবাদাম, ফিল্টার রড, জীবাশ্ম জ্বালানি, জিপসাম বোর্ড ও প্লাস্টার, পিভিসি ও পেট রেজিন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, বাইসাইকেল যন্ত্রাংশ, ১ কেভি পর্যন্ত ট্রান্সফরমার, ওয়াশিং মেশিন, রাবার কনভেয়ার বেল্ট, গ্রিজপ্রুফ ও গ্লাসিন পেপার, মেইজ স্টার্চ, টলুইন, কোল্ড রোলড কোটেড কয়েল ও শিট, কপার ওয়্যার ও টিউব, ফিনিশড অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এবং স্থানীয় মোটরসাইকেল শিল্পের জন্য ১২০০ ওয়াটের নিচের ডিসি মোটর।
রাজস্ব আহরণের কড়াকড়ির পাশাপাশি শিল্পায়ন, নতুন খাতের বিকাশ এবং ভোক্তা ও ব্যবসার ওপর চাপ কমাতে বাজেটে উল্লেখযোগ্য কর ও শুল্ক ছাড়ের দিকও রাখা হয়েছে। বিশেষ করে কৌশলগত শুল্ক যৌক্তিকীকরণের অংশ হিসেবে কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট কমানো হয়েছে, যাতে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ে এবং উৎপাদন খরচ কমে। ফ্রিজ, ফ্রিজার, এসি, ওয়াশিং মেশিন এবং স্মার্ট বা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট হ্রাস করা হয়েছে।
এর বাইরে উচ্চপ্রযুক্তি খাতেও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং এবং কম্পিউটার হার্ডওয়্যার উৎপাদনের উপকরণ যেমন এসএসডি, পিওএস মেশিন, ডেস্কটপ, সার্ভার, রাউটার ও মনিটরের ক্ষেত্রে কর সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ এবং সৃজনশীল খাতের প্রসারে নতুন আয়ের ওপর কর অব্যাহতির সুযোগও রাখা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও টেকসই অবকাঠামোর অগ্রগতি:
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য সামনে রেখে এবারের বাজেটে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও সবুজ প্রযুক্তি খাতে একাধিক শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, কম-কার্বন পরিবহন এবং পরিবেশ সুরক্ষামূলক অবকাঠামো উন্নয়নে উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), প্লাগ-ইন হাইব্রিড (পিএইচইভি), চার্জিং স্টেশন এবং লিথিয়াম-আয়ন ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কাঁচামাল আমদানিতে উল্লেখযোগ্য শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে সবুজ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ড্রেজার ও টাগবোটের যন্ত্রাংশ এবং বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ব্যবহৃত রাসায়নিকের ওপর শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নৌ-অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, ইটিপি রাসায়নিক এবং কয়লা আমদানিতেও শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে আসছে। এ পরিস্থিতি কিছুটা লাঘব করতে এবারের বাজেটে বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী পণ্যের ওপর করহার কমানো বা শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ব্যবসা পরিবেশ সহজীকরণ ও আইনি সংস্কার:
রাজস্ব বাড়ানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ ও ব্যবসা পরিবেশ উন্নত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে আমদানি, সরবরাহ, সেবা এবং বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে উৎসে কর (টিডিএস) কিছুটা হ্রাস করা হয়েছে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির রিটেইনড আর্নিংস বা পুঞ্জীভূত মুনাফার ওপর কর কাঠামোও যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছে। আয়কর আইনের ধারা ৫৫ ও ৫৬ সংশোধনের মাধ্যমে অননুমোদিত ব্যয় কমানো এবং অবচয়ের ভিত্তি সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যা করদাতাদের জন্য আইনি জটিলতা কমাতে সহায়ক হবে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন জমা দিলে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা স্বেচ্ছা কর পালনে উৎসাহ দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো কর, ভ্যাট ও কাস্টমস সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে আপিল করার সময় জমা দিতে হওয়া অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার পাশাপাশি ভ্যাট ও কর ফেরত প্রক্রিয়াও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাজেটের সামগ্রিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার একদিকে বিভিন্ন খাতে বড় পরিসরে শুল্ক ও কর ছাড় দিয়েছে, অন্যদিকে সেই ঘাটতি পূরণের কৌশল হিসেবে কর পরিপালন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করছে।
তবে একটি গবেষণাধর্মী ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। বাজেটে যদি স্পষ্টভাবে জানানো হতো কর ছাড় ও রেয়াতের কারণে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি (ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার) কত এবং একই সঙ্গে কর বৃদ্ধি ও নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভাব্য অতিরিক্ত রাজস্ব কত হতে পারে, তাহলে নীতিগত বিশ্লেষণ আরও স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য হতো। এ ধরনের পরিসংখ্যান থাকলে দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্য এবং নীতির টেকসইতা আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যেত।
তবুও শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে শুল্ক যৌক্তিকীকরণসহ যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্থানীয় উৎপাদন ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এসব উদ্যোগ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে পুরো রাজস্ব কৌশল বা উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যকারিতার ওপর। কর জাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি তাদের নিশ্চিত করতে হবে যাতে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা হয় স্বচ্ছ, সহজ এবং কার্যকর। একই সঙ্গে সৎ করদাতারা যেন কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা হয়রানির মুখে না পড়েন, আবার রাষ্ট্রের প্রাপ্য রাজস্ব আদায়ও যেন ব্যাহত না হয়—এ ভারসাম্য রক্ষা করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
কর ভিত্তি স্থায়ীভাবে বিস্তৃত করতে হলে ভ্যাট ও কর নিবন্ধিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন রিটার্নে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি কার্যকর চালিকাশক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

