রাষ্ট্রীয় ব্যয়, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি হলো রাজস্ব বা রাষ্ট্রীয় আয়। এই আয় মূলত জনগণের কাছ থেকেই সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু যখন এই রাজস্ব সরকারি ব্যয় মেটাতে পর্যাপ্ত হয় না, তখন সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণ এবং বিদেশি সহায়তার দিকে যেতে হয়। এসব ঋণ সাধারণত ট্রেজারি বন্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। তবে সরকারি ঋণ কতটা গ্রহণযোগ্য বা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ—এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ভিন্ন মত রয়েছে।
অর্থনীতির নব্য ধ্রুপদি ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব পল স্যামুয়েলসন সরকারি ঋণকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর চাপ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, সরকারি ঋণ বংশধরদের ওপর একটি বোঝা হিসেবে পড়ে। তাঁর মতে, সব ধরনের ঋণই ক্ষতিকর, আর সরকারি ঋণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে। মূলত এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ঋণের চাপ স্থানান্তরের সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক বিবেচনায় তিনি এই মত দেন।
অন্যদিকে ধ্রুপদি অর্থনীতির অন্যতম প্রবক্তা অ্যাডাম স্মিথ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ওয়েলথ অব নেশনস-এ ঘাটতি বাজেট নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেন। তাঁর মতে, সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে যে ঘাটতি তৈরি হয়, তা থেকে ঋণ গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এমনকি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণও জাতির সমৃদ্ধির স্বাভাবিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, ব্যক্তি খাত যে সম্পদ উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করতে পারত, তা রাষ্ট্রীয় ব্যবহারে গেলে অনেক সময় অকার্যকর ও অপচয়মূলক খাতে ব্যয় হয়।
তবে অর্থনীতির ধ্রুপদি ধারা পুরোপুরি ঋণবিরোধী নয়। নির্দিষ্ট সীমিত ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বড় অবকাঠামো নির্মাণের মতো উৎপাদনশীল প্রকল্পে ঋণ গ্রহণকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা হয়।
পরবর্তী সময়ে উন্নত দেশগুলোতে সরকারি ঋণের প্রবণতা কিছুটা কমে আসে। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে স্বর্ণমান ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণের সঙ্গে মুদ্রার মান নির্ধারিত থাকায় অর্থ সরবরাহ সীমিত ছিল। ফলে সরকারি ব্যয় করার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে কঠোর রাজস্ব শৃঙ্খলা ও সামরিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণও ঋণ নির্ভরতা কমাতে ভূমিকা রাখে।
কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৩০-এর মহামন্দার পর সরকারি অর্থনৈতিক চিন্তায় বড় পরিবর্তন আসে। এই সময়ে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস যুদ্ধকালীন অর্থায়ন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারি ঋণ গ্রহণকে যুক্তিসংগত বলে মত দেন। এরপর থেকে অনেক দেশে সরকারি ঋণ অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় এবং মহামন্দার প্রেক্ষাপটে কেইনস যুক্তি দেন যে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো মোট চাহিদা। যখন বেসরকারি খাতে চাহিদা কমে যায়, তখন রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে হবে। তাঁর মতে, ঘাটতি বাজেটের মাধ্যমে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ালে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতিতে গতিশীলতা ফিরে আসে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কেইনসীয় অর্থনীতির প্রভাব আরও বাড়ে। যুদ্ধ-পরবর্তী মন্দার আশঙ্কা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ অবকাঠামো, বড় প্রকল্প এবং সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি দেখা দেয়। তবে একই সঙ্গে সরকারি ঋণের পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৬ সালে উন্নত দেশগুলোর গড় ঋণ-জিডিপি অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় ১৫০ শতাংশে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে এটি ছিল প্রায় ২৫০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০৬ শতাংশ।
জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের শেষ ত্রৈমাসিকে সরকার প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বাইরে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ছোট আকারের ঋণ গ্রহণও অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি উৎস মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ২২ লাখ কোটি টাকা। সরকারি ঋণ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক, স্বেচ্ছামূলক ও বাধ্যতামূলক ঋণ। এর বাইরে অর্থনীতিবিদরা ঋণকে আরও দুই ভাগে ভাগ করেন—উৎপাদনশীল ও অনুৎপাদনশীল।
যেসব ঋণ সড়ক, সেতু, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে উৎপাদনশীল ঋণ হিসেবে ধরা হয়। এসব প্রকল্প থেকে আয় অর্জন সম্ভব হয় এবং তা দিয়ে ঋণের সুদ ও মূলধন পরিশোধ করা যায়। অন্যদিকে প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, ত্রাণ বা সামাজিক সেবায় ব্যয় হওয়া ঋণকে অনুৎপাদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এসব খাত সরাসরি উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না। অনেক সময় বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্পও এই শ্রেণিতে পড়ে যদি তা পর্যাপ্ত আয় সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। উদাহরণ হিসেবে কর্ণফুলী টানেলের মতো প্রকল্পের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়।
এই সব ঋণ পরিশোধ করতে হয় মূলত রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে। ফলে অতিরিক্ত ঋণ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। তবুও আধুনিক অর্থনীতিতে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারি ঋণকে একটি গ্রহণযোগ্য কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়নশীল দেশের জন্য কর-জিডিপি অনুপাত ৪০ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত। উন্নত দেশের ক্ষেত্রে এই সীমা প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হয়, কারণ তাদের আয় ও পরিশোধ সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৩৯ শতাংশ। ভারতের ৮২ শতাংশ, পাকিস্তানের ৮৩ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার প্রায় ৯৬ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের ঋণের অবস্থান এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য সীমার মধ্যেই রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ভর করে ভবিষ্যৎ ব্যয় ও আয় ব্যবস্থাপনার ওপর।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে দেড় লাখ কোটি টাকার নতুন ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা, আগের মতোই দৈনন্দিন ঋণ গ্রহণ এবং মোট সাড়ে ২২ লাখ কোটি টাকার ঋণ—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো, এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা এবং পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধ—এসব খাতে ভবিষ্যতে আরও ঋণ নির্ভরতা বাড়তে পারে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির কথা বললেও বাস্তব ব্যয় কাঠামো বিবেচনায় তা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করলে বাজারে তারল্য কমে যায়।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়তে থাকলে অর্থনীতি আরও ঋণনির্ভর হয়ে পড়বে। এতে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

