আসন্ন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তার খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এসব খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা, যা প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ২৮ শতাংশের কাছাকাছি।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে আগামী অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় প্রায় ৮ শতাংশ বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বিবেচনায় এই হিসাব আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রস্তাবিত হিসাবেও এসব খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তবে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে তা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, সরকারের ঋণের সুদের চাপও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর সুদের হার বেশি হওয়ায় এ খাতে ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। আগামী বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট অব্যাহত থাকে, তাহলে সুদের ব্যয় আরও বাড়বে। এতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা মিলিয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা, তরলীকৃত গ্যাসে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সার খাতে ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং খাদ্য সহায়তায় প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া প্রবাসী আয় বাড়াতে প্রণোদনার পরিমাণ বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। তবে কৃষি, রপ্তানি ও পাট খাতে প্রণোদনা আগের মতোই রাখা হতে পারে।
আসন্ন বাজেটে ঘাটতির পরিমাণও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
এই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশি ও বিদেশি উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ ঋণের উচ্চ সুদের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যদি ভর্তুকি যথাযথভাবে লক্ষ্যভিত্তিক না হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় অকার্যকর হয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সার্বিক ব্যয় কাঠামোয় সংস্কার এনে অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় খাতে সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সুদ ও ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সীমিত করে দিতে পারে।

