দেশের অর্থনীতি একসঙ্গে একাধিক চাপের মুখে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি দুর্বল। পাশাপাশি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে অতিরিক্ত চাপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—কোন সংকটকে আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, নাকি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই এখন একসঙ্গে নীতিনির্ধারণের চাপে রয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে। টানা তিন বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতাও কমে গেছে।
একই সময়ে আর্থিক খাতেও চাপ বেড়েছে। কয়েকটি ব্যাংককে কার্যক্রম সচল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে তারল্য সহায়তা দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। অন্যদিকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয় সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থনীতিকে চাঙা করতে চাইলেও ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত।
বৈদেশিক খাতে প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি দিলেও রপ্তানি খাত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, রপ্তানি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে এবং প্রবাসী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানি খাতেও নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রবণতা থাকলে টাকার অবমূল্যায়নের চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়লে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।
সব মিলিয়ে, আগে থেকেই নানা কাঠামোগত দুর্বলতায় থাকা অর্থনীতি এখন আরও জটিল পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে, আস্থা পুনরুদ্ধার করতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে একটি সুসংগঠিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশল প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি হয়ে উঠেছে।
নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রথম লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস:
দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ শুরু হয় মূলত কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এ চাপ অব্যাহত থাকে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও ধারাবাহিক উদ্যোগের ঘাটতি দেখা গেছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন। শেষ পর্যায়ে নীতি সুদের হার বাড়ানো হলেও ততদিনে মূল্যস্ফীতির চাপ অনেকটাই স্থায়ী রূপ নেয়।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতি সুদহার ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তবে টানা তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। এর মানে হলো, আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।
প্রকৃত আয় কমলে সাধারণত মানুষ ব্যয় সংকোচন করে এবং সঞ্চয়ের দিকে ঝোঁকে। এতে বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমে গেলে ব্যবসা ও শিল্প খাতে প্রভাব পড়ে, উৎপাদন হ্রাস পায় এবং নতুন বিনিয়োগও ধীর হয়ে যায়। দেশের অর্থনীতিতে এই প্রবণতাগুলোর প্রভাব ইতিমধ্যে লক্ষ্য করা গেছে।
এ অবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর চাপের মধ্যে রয়েছে নতুন সরকার। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সুদহার কমানোর দাবি উঠছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর মুদ্রানীতির প্রয়োজন রয়েছে। এই দুই বিপরীত চাপে নীতিনির্ধারকদের জন্য ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
কর্মসংস্থানের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে:
অর্থনীতির নীতিনির্ধারণে এখন এক ধরনের দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে সরকার। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপ, অন্যদিকে বেকারত্ব কমানোর চ্যালেঞ্জ। এই দুই লক্ষ্য প্রায়ই পরস্পরের বিপরীতমুখী হয়ে ওঠে, ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সাধারণভাবে বেকারত্ব কমাতে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো হয়। এতে মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছায়, ভোগব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিক চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এই চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাব হিসেবে অনেক সময় মূল্যস্ফীতির হারও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাধারণত সুদের হার বাড়ানো হয়। এতে ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যায়, বিনিয়োগ কমে আসে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়ে পড়ে। ফলে বেকারত্বের চাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি এখন নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে—সরকার কোন পথে এগোবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনো একটি সমস্যাকে আলাদা করে সমাধান করা নয়; বরং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা। এই ভারসাম্যই আগামী দিনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রবৃদ্ধির আগে এখন স্থিতিশীলতা জরুরি:
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের মতে, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে সামনে আনতে হলে তার আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। কারণ, স্থিতিশীল মূল্যস্তর ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকেই প্রবৃদ্ধির স্বাভাবিক ধারা থেকে ছিটকে যায়। এরপর বিভিন্ন সময়ে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নিয়ে উচ্চ অঙ্কের তথ্য প্রকাশিত হলেও তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অর্থনীতিবিদদের একাংশের মধ্যে। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০২২–২৩ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। অর্থাৎ টানা তিন অর্থবছর ধরে প্রবৃদ্ধির পতন ঘটেছে।
করোনা-পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছিল, দ্রুত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের পরিবর্তে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। তবে কোভিডের পর ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে শুরুতে বিপর্যস্ত করলেও অনেক দেশই পরে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
এখন পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা নয়, পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে আনা হচ্ছে। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা অর্জনের জন্য ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ, উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের আগেই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো জরুরি। এর ওপর আবার বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি, নতুন করে চাপ তৈরি করছে।
দারিদ্র্য ইস্যু আবার সামনে:
মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার প্রভাব এখন দারিদ্র্য বৃদ্ধিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সর্বশেষ ২০২২ সালে যে জরিপ করে, সেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর আর কোনো হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচআইইএস) প্রকাশ করা হয়নি।
তবে গত নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশে। এই হিসাবে বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে যুক্ত হয়েছে। দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই প্রবণতা থামাতে হলে মানুষের আয় বৃদ্ধির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরও বাংলাদেশে ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য কমার গতি ধীর হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি বাড়লেও তা আগের মতো দ্রুতগতিতে দারিদ্র্য হ্রাস করতে পারছে না।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লে দারিদ্র্য গড়ে ০ দশমিক ৯ শতাংশ কমে। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়লে দারিদ্র্য কমে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, প্রবৃদ্ধির সুফল বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে স্পষ্ট হচ্ছে যে কেবল প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং প্রবৃদ্ধির সুফল সুষমভাবে বণ্টন এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বৈষম্য অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে:
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশের জিনি সহগ ছিল ০ দশমিক ৪৫৮। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০ দশমিক ৪৯৯-এ।
তত্ত্বগতভাবে জিনি সহগ শূন্যের কাছাকাছি হলে আয়বণ্টন সমান ধরা হয়, আর ০ দশমিক ৫০-এর কাছাকাছি পৌঁছালে উচ্চ মাত্রার আয়বৈষম্য নির্দেশ করে। বর্তমান সূচক সেই সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা আয়বৈষম্য বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ এখন মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। একই সঙ্গে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী জাতীয় আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় অংশ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা। অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যবিত্তের আয় অংশ কমে যাওয়া সরাসরি ভোক্তা চাহিদায় প্রভাব ফেলে। চাহিদা কমে গেলে বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়, যা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে যায়—যার লক্ষণ ইতিমধ্যে অর্থনীতিতে দৃশ্যমান বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কর্মসংস্থান কোথায়:
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার দেখা গেলেও তা কর্মসংস্থান তৈরিতে ততটা কার্যকর হয়নি বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ। অর্থাৎ জিডিপি বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের আয় বৃদ্ধির মতো পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করেন। একই সময়ে শ্রমবাজারে নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ। ফলে বড় একটি অংশ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান পায়নি। যাঁরা চাকরি পেয়েছেন, তাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্ত হয়েছেন তুলনামূলক কম উৎপাদনশীল কৃষি খাতে। অন্যদিকে উৎপাদনশীল শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমে গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শিল্প খাত বছরে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হলেও একই সময়ে এই খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও তার বড় অংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশ হলেও সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র প্রায় ৬ শতাংশের মতো।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বিনিয়োগ দুর্বলতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। করোনা মহামারির সময়েও বিনিয়োগ পরিস্থিতি এতটা দুর্বল ছিল না বলে তারা মনে করেন। জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সংকট ছিল আস্থাহীনতা। এই আস্থাহীনতার কারণে বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসেনি। এর ফলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে বিভিন্ন মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়।
নারী কর্মসংস্থানের চিত্রও উদ্বেগজনক। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন তরুণীর একজন এখনো কর্মসংস্থানের বাইরে। শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যে প্রতি চারজনের একজন কাজ পাচ্ছেন না। শহরে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০১৬ সালে ৩১ শতাংশ থাকলেও ২০২৩ সালে তা কমে ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
বর্তমানে অনেক নারী কম বেতনের অনানুষ্ঠানিক কাজে, বিশেষ করে কৃষি খাতে যুক্ত হচ্ছেন। কৃষি খাতে কর্মীদের প্রায় ৫৮ শতাংশই নারী। বিপরীতে শিল্প খাতে নারীর অংশগ্রহণ কমে গেছে, যা আগে তৈরি পোশাকশিল্পের সম্প্রসারণের ফলে বেড়েছিল।
যুব শ্রমশক্তির অবস্থাও চাপের মধ্যে রয়েছে। ২০২৩ সালে যুব বেকারত্বের হার ছিল ৮ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৪ শতাংশ। পাশাপাশি প্রায় ১৬ শতাংশ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের কোনো ধারায় যুক্ত নন। এই গোষ্ঠীর মধ্যে বড় অংশই নারী এবং শহরাঞ্চলের তরুণ-তরুণী।
এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় ২২ লাখ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার জায়গা হলো বিনিয়োগের দুর্বল গতি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে চিত্র বদলেছে। এখন সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশে। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে হয়েছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। একই সঙ্গে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগের এমন দুর্বল পরিস্থিতি করোনা মহামারির সময়েও দেখা যায়নি। জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আগে থেকেই ছিল, তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আস্থার সংকট। এই আস্থাহীনতার কারণে বেসরকারি খাত প্রত্যাশিত গতিতে সম্প্রসারিত হয়নি। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে বিভিন্ন মূল্যায়নে উল্লেখ রয়েছে। এই অবস্থায় নতুন সরকারের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি এখন অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বিনিয়োগে আস্থা পুনরুদ্ধারের পথ কী:
অতীতে বেসরকারি খাতে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে নীতি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে কিছু গোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু ক্ষেত্রে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পাচার করা অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ শুরু হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি স্থিতিশীল ও আস্থাভিত্তিক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা। এর জন্য ব্যবসা পরিচালনার সময় ও ব্যয় কমানো এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
জ্বালানি খাত ঘিরে ঝুঁকি বাড়ছে:
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গ্যাস–সংযোগ না পাওয়ার কারণে বহু কারখানা চালু না হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এই খাত নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠে এসেছে। ২০০৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ৩২টি দাতা দেশ ও সংস্থার পক্ষ থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানে সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। চলমান ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ফলে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। এর প্রভাব মোকাবিলায় সরকার মূল্য সমন্বয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। তবে এখানে নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর দাম না বাড়ালে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে জ্বালানি খাতে সরকার এখন স্পষ্ট এক ধরনের উভয়সংকটে রয়েছে।
সুদহার কমানো আপাতত অনুচিত:
উদ্যোক্তাদের একটি অংশ বিনিয়োগে বাধা হিসেবে উচ্চ সুদহারের কথা বললেও অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদহার ও বিনিয়োগের সরাসরি সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে একরৈখিক নয়। উচ্চ সুদহার থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে বিনিয়োগ বেড়েছে—এমন উদাহরণও রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়েছিল, যা বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। অনেক দেশ এ ধরনের মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদদের অভিমত।
সম্প্রতি নীতি সুদহার কমানোর বিষয়ে আলোচনা হলেও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ এখনই এতে পরিবর্তন আনার পক্ষে নয়। তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এ অবস্থায় সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বাড়তে পারে।
সরকার বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, নির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষিঋণ মওকুফ, বেকার ভাতা এবং দেউলিয়া ঘোষিত কিছু ব্যাংকের আমানত ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়ছে।
কিন্তু রাজস্ব আয়ের বর্তমান পরিস্থিতি এসব ব্যয়ের চাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, কর–জিডিপি অনুপাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা উন্নয়ন কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় অনেক কম। বিশ্বব্যাংক বলছে, টেকসই উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য এই অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত।
বর্তমান বাস্তবতায় রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। ফলে অর্থনীতির সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার এবং ব্যয়ের চাপ সামলানো। এই তিনটির ভারসাম্য রক্ষা না করতে পারলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হয়ে উঠবে।
টাকা ছাপিয়ে ঋণ এড়িয়ে গেলেও ব্যাংকে বাড়ছে চাপ:
সরকার সাধারণত বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দুইভাবে ঋণ নেয়। প্রথমটি হলো বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া। এই ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো নিজেদের আমানতকারীদের অর্থ সরকারকে ঋণ হিসেবে দেয়। সরকার পরে সেই অর্থ সুদসহ ফেরত দেয়।
দ্বিতীয় পথ হলো সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সরকারের ট্রেজারি বিল বা বন্ড কিনে নেয় বা ওভারড্রাফট সুবিধা দেয়, তখন নতুন রিজার্ভ মানি তৈরি হয়। অর্থনীতিতে এটিকেই অনেক সময় ‘টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া’ বলা হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়ে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার ঘটনা ঘটে বলে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন। একই সময়ে সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর একীভূত পাঁচটি ব্যাংককে সহায়তা দিতে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা দেন বলেও উল্লেখ রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ধরনের অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ বাজারে তারল্য বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় নতুন সরকারকেও ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমে যায়, ফলে বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হয়। এই কারণে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ছাড়া সরকারের হাতে কার্যকর বিকল্প সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজস্ব প্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েও অগ্রগতি ধীর হয়েছে। দাতাদের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ ঋণপ্রাপ্তিতে এর প্রভাব কতটা পড়ে, তা নিয়েও অর্থনৈতিক মহলে নজর রয়েছে। বর্তমান সময়ে সরকারের নজর তুলনামূলকভাবে বৈদেশিক ঋণের দিকেই বেশি।
ব্যাংক সংস্কারই একমাত্র পথ:
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের সঞ্চিত সমস্যার ফল। অতীতে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থপাচারের অভিযোগে ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা কমেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাত সংস্কারের একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সুদহার যৌক্তিক করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তদারকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে দেওয়া, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। এছাড়া অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ব্যাংকার ও করপোরেট নেতাদের সমন্বয়ে একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্তি, সংস্কার কমিশন গঠন এবং অন্যান্য প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কবে শুরু হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই প্রক্রিয়ার গতি ভবিষ্যৎ ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
খেলাপি ঋণ বিপৎসীমা ছাড়িয়ে গেছে:
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলেছিল, বাংলাদেশে একটি প্রভাবশালী শ্রেণির মধ্যে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও গোষ্ঠী আর্থিক খাতের সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তার করে, এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরে নির্বাচনের আগে বিশেষ নীতিগত ব্যবস্থায় পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার পর হার কিছুটা কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নামে। এই হার এখনো এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি। তারা বলছেন, খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান ছাড়া ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার—দুটিই কঠিন হয়ে পড়বে।
নতুন গভর্নরের সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়:
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি। তাঁর নিয়োগ নিয়ে শুরু থেকেই নানা আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক গভর্নরকে যেভাবে বিদায় দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে সমালোচনা আছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি নীতি সুদহার সমন্বয়ের উদ্যোগ নেন। তবে প্রথম দফার উদ্যোগটি সফল হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ধরে রেখেছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে সুদহার কমানো ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই দুই লক্ষ্যকে ভারসাম্যে রাখা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময়ে একীভূত করা পাঁচটি ব্যাংকের মালিকপক্ষের একটি অংশ তার সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট ছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। তাদের অনেকেই এখনো পলাতক বা কারাগারে আছেন, আবার কেউ কেউ ফিরে আসার চেষ্টা করছেন বলে জানা যায়।
এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করাও নতুন গভর্নরের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাবেক গভর্নরের সময়ে বড় কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপের আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচার তদন্ত শুরু হয়েছিল। এসব অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগও দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রভাবশালী হওয়ায় এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এর মধ্যে নতুন করে ছয়টি বড় গ্রুপের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানা গেছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সমর্থনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বৃদ্ধির সক্ষমতার পরীক্ষা:
নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা ও তদারকির দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এর বাস্তব পরীক্ষা শুরু হবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের সময়। অতীতে দেখা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের সময় দলীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক পরিচালনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে একাধিক আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটেছে। নতুন সরকার কী ধরনের নিয়োগ দেয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সেই প্রক্রিয়ায় কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে—এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়।
নতুন ব্যাংক অনুমোদন নিয়ে নীতিগত প্রশ্ন:
দেশে বর্তমানে তফসিলি ব্যাংক ৬২টি। এর মধ্যে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত এবং ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংক। বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের সম্প্রসারণ মূলত রাজনৈতিক সরকারগুলোর সময়েই হয়েছে। এরশাদ সরকারের সময় প্রথম বেসরকারি ব্যাংক অনুমোদনের পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
তবে ব্যতিক্রম ছিল ২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময়। তখন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বাজেটে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে নতুন কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হবে না, এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে আবার নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। ফলে ব্যাংক খাতের সম্প্রসারণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বর্তমানে আবারও নতুন ব্যাংক, বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়ে আলোচনা চলছে। শেষ পর্যন্ত কারা এই লাইসেন্স পাবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক চাপ কতটা প্রভাব ফেলবে—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে নতুন গভর্নরের সামনে একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জ। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে সুদহার সমন্বয়। পাশাপাশি ব্যাংক একীভূতকরণ, খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার তদন্ত এবং রাজনৈতিক চাপ সামলানো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে তিনি কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং নীতিগত চাপ কতটা সামলাতে সক্ষম হন তার ওপর।
সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখাই এখন মূল পরীক্ষা:
বর্তমান পরিস্থিতিতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্টভাবে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এই পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এর আগে ২০২২ সালের ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের অভিঘাত এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। সেই চাপের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করেছে, যা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব অর্থনীতিকেই নতুন সংকটে ফেলেছে। এই বাস্তবতায় সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে অর্থনীতির কৌশলী ব্যবস্থাপনা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর চাপ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং প্রবাসী আয় সাময়িকভাবে বাড়লেও মধ্যমেয়াদে তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ অবস্থায় নতুন সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপরই নির্ভর করবে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা টেকসই থাকবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে অর্থনীতির সামগ্রিক গতি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।

