বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যেই এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অন্তত ১৬টি দেশে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ইতিবাচক সাড়া দিলে এসব দেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর নতুন দরজা খুলবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট প্রবাসী কর্মীর প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। উপসাগরীয় ছয়টি দেশেই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান রয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরব একাই মোট প্রবাসী কর্মীর প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের গন্তব্য। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়, মোট আয়ের ৬০ শতাংশের বেশি আসে এই অঞ্চল থেকে। ফলে দেশের শ্রমবাজারের একমুখী নির্ভরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় নতুন শ্রমবাজার খোঁজার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। মন্ত্রণালয়ের মতে, নতুন দেশগুলো থেকে সাড়া পাওয়া গেলে নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর চাপ কমবে এবং শ্রমবাজার আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে। এদিকে গত ৪ মার্চ প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে থাইল্যান্ড-বাংলাদেশ কর্মী পাঠানো সংক্রান্ত এমওইউ ও অ্যাগ্রিমেন্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, এই চুক্তি বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সভা সূত্রে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ইতিবাচক মতামতের পর নিয়ম অনুযায়ী খসড়া সমঝোতা স্মারক আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। ভেটিং শেষে এটি মন্ত্রিপরিষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন পেলে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এমওইউ সই করবে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গত কয়েক মাসে প্রায় ১৭টি দেশে এমওইউ পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সার্বিয়া, রোমানিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া, মাল্টা, পর্তুগাল, স্পেন, মরিশাস, লেবানন, থাইল্যান্ড, ওমান, অস্ট্রিয়া, আলবেনিয়া ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশ।
থাইল্যান্ড প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, এমওইউটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে। এখন দেশটির সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছে। তারা সই করলে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চাহিদা (ডিমান্ড) চাওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, “সব দেশ থেকেই আমরা ইতিবাচক সাড়া আশা করছি। সরকারও এ বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। অনেক দেশের সঙ্গে এমওইউ থাকলেও ডিমান্ড লেটার পাওয়া যাচ্ছে না।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব-পশ্চিম ইউরোপ অনুবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে মাইগ্রেশন, মোবিলিটি, রিক্রুটমেন্ট ও রিপ্যাট্রিয়েশন কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন দেশে সমঝোতা স্মারক পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে কিছু দেশ ইতোমধ্যে চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম ইউরোপ ও ইইউ অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, “আমরা কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। হাইকমিশনের মাধ্যমে কাজগুলো এগিয়ে নেওয়া হয়। গত বছর ইতালির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক হয়েছে। তবে এসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যের মতো নয়, যেখানে চাইলেই ডিমান্ড লেটার পাওয়া যায়। অনেক দেশ অবৈধ শ্রমিকদের ফেরত নেওয়ার শর্তে ডিমান্ড দিতে চায়। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
বর্তমানে ইউরোপের মতো স্থিতিশীল শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। ইউরোপে মোট বাংলাদেশি কর্মীর অংশ ৫ থেকে ৭ শতাংশের নিচে। ইতালি ও গ্রিসে কিছু সুযোগ থাকলেও নিয়মিত কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এজেন্সি পর্যায় ও সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি, ভিসা জটিলতা, দক্ষতার অভাব এবং সমন্বয়হীনতার কারণে সম্ভাবনাময় বাজারগুলোতে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে প্রায়ই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার প্রভাব শ্রমিকদের ওপর পড়ে। তাই নতুন শ্রমবাজারের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। তার মতে, শুধু এমওইউ নয়, নিয়মিত ডেলিগেশন পাঠানো এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। না হলে শ্রমবাজার খোলা কঠিন হবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন বাজার খোলার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা এবং কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। তা না হলে ইউরোপসহ স্থিতিশীল শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ সীমিতই থেকে যাবে।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, সরকারের বাস্তবমুখী উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। তার অভিযোগ, শ্রমবাজার নিয়ে নীতি-নির্ধারণে ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে বিএমইটির একটি প্রতিনিধি দল প্রায় ৫০টি দেশ ঘুরে একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছিল, কিন্তু সেটি পরে বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

