এক বছরের ব্যবধানে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। রাজস্ব ঘাটতি ও বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধার নেওয়ার প্রবণতা বাড়ায় ঋণের এই উল্লম্ফন ঘটেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৯ লাখ ৪২ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।
ব্যাংকারদের মতে, প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়া এবং বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সরকারকে ব্যাংক ও ব্যাংক-বহির্ভূত উৎসের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে দেশের মোট পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল ৪০ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। ফলে এই সময়ের মধ্যে ঋণ বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ব্যাংক খাত থেকেই নেওয়া হয়েছে ৬৪ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা। আর ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে নেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। বিপরীতে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল ১৫ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ২৪ হাজার ৬১২ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচন আয়োজন, নতুন ব্যাংকে বিনিয়োগ এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে। মূলত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎসের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে, যা ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
প্রতিবছর বাজেটে ঘাটতি রেখে তা পূরণের জন্য সরকার সাধারণত দুই উৎস—অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত—থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। তবে বৈদেশিক সহায়তা প্রত্যাশা অনুযায়ী না এলে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এই অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থা, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি এবং সঞ্চয়পত্র।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা (অনুদানসহ), যা জিডিপির প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ। অনুদান বাদ দিলে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অ-ব্যাংকিং উৎস থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্র খাত থেকে আসবে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে নেওয়া ঋণের বড় অংশই ব্যাংক খাত থেকে এসেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। আর ব্যাংকবহির্ভূত খাতে এই অঙ্ক ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকার মোট ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা। অর্থবছরের তিন মাস বাকি থাকতেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণ স্থিতি এখন ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, সরকারের বৈদেশিক ঋণও ঊর্ধ্বমুখী। গত জুন পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১১ কোটি টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ১৩ লাখ ৯২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ দশমিক ৭০ টাকা ধরে)।

