দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের মূলধন সংকট কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি কমাতে তারল্য সহায়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখতে ‘ট্রেড সাপোর্ট’ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে আইএফসি।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান দুর্বলতা কাটাতে আইএফসি পৃথকভাবে ব্যাংকভিত্তিক সমীক্ষা চালাবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী পুঁজি সরবরাহ করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধারে কাজ করবে। এতে বাজারে তারল্য সংকট কমবে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তিনি আরও জানান, শুধু ব্যাংক নয়, মূলধন সংকটে থাকা বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সহায়তার আওতায় আনতে চায় আইএফসি। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে পুনরায় চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও নতুন ভাবনা এসেছে। বড় সম্পদগুলো সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে ব্যবহার করে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে। এতে সরকারের সরাসরি অর্থায়নের চাপ কমবে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।
অর্থমন্ত্রী মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় আইএফসির বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে ব্যাংক খাত শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
এর আগে তিনি ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন এবং জেপি মরগান-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, নতুন আর্থিক পণ্য চালু এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থা কাটাতে বন্ডসহ নতুন আর্থিক পণ্য চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জেপি মরগানের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শ্রমবাজার নিয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বৈঠকে। আইওএমের সঙ্গে আলোচনায় বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আর্থিক শোষণ কমানোর বিষয়টি উঠে আসে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়াগামী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ জোরদার এবং নতুন বাজার যেমন ইউরোপ ও জাপানে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী।
সরকার ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যেও কাজ করছে বলে জানান তিনি। গ্রামীণ কুটিরশিল্প, তাঁতি, কামার ও কুমারদের পণ্যকে বাণিজ্যিকভাবে বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খেলাধুলা ও সংস্কৃতিভিত্তিক অর্থনীতিকেও ভবিষ্যতে জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে অতীতের অনিয়ম দূর করা জরুরি। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তন আনা এবং দেশকে ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে ইমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবশেষে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, সরকারের প্রতিটি বিনিয়োগ প্রকল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে প্রধান শর্ত। রিটার্ন, ভ্যালু ফর মানি, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ—এই চার বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েই ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া হবে।

