আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে কমিয়ে ‘নেতিবাচক’ করেছে। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘বি প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘বি’ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ঋণমানের পূর্বাভাসে এই পরিবর্তনকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসঅ্যান্ডপি জানিয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত মোকাবিলা করা না গেলে ভবিষ্যতে ঋণমান আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ঋণমান একটি দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে বৈশ্বিক ধারণা তৈরি করে। ঋণমানের নেতিবাচক পূর্বাভাস দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ঋণ গ্রহণ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
এসঅ্যান্ডপি তাদের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির কয়েকটি দীর্ঘদিনের সমস্যাকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা এবং প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে আরেক আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংসও বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ করেছিল। সংস্থাটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
ফিচ রেটিংসের পর এবার এসঅ্যান্ডপির একই ধরনের সতর্কতা দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো এখনো কাটেনি—এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে সরকারের সামনে এখন অর্থনীতির সাময়িক চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এসঅ্যান্ডপির প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল সম্পদমান, বেড়ে যাওয়া খেলাপি ঋণ এবং সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে আর্থিক খাত এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে পারেনি বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
এসঅ্যান্ডপি জানিয়েছে, গত তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন বছরে দেশের গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে। প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেলে মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অতীতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের তুলনামূলক কম মাথাপিছু আয়ের সীমাবদ্ধতা অনেকটা আড়াল করেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে দেশের ঋণমানের পূর্বাভাস আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত নিয়ে কিছুটা আশাবাদের কথা বললেও বেশ কয়েকটি বড় ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল।
সংস্থাটি বলেছে, শক্তিশালী প্রবাসী আয়, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা এবং নতুন আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, তৈরি পোশাক রপ্তানির দুর্বলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্কনীতিকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে তারা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এতে চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, নতুন বাজার খোঁজা এবং বৈদেশিক আয়ের উৎস সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
এসঅ্যান্ডপির প্রতিবেদনে দেশের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং ব্যবসার পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা এখনো বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না গেলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছে এসঅ্যান্ডপি।
তবে এসঅ্যান্ডপির মূল্যায়নে শুধু ঝুঁকির বিষয়ই উঠে আসেনি। সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সরকার ঘোষিত ব্যাংকিং, রাজস্ব ও অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে অর্থাৎ বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতির দুর্বল জায়গাগুলোতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন কোনো দেশের অর্থনীতির চূড়ান্ত চিত্র নয়। তবে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য অর্থায়ন এবং উন্নয়ন সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে এসব মূল্যায়নের বাস্তব প্রভাব রয়েছে। এর আগে এসঅ্যান্ডপি, ফিচ রেটিংস ও মুডি’স বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে সতর্ক করেছে। এবারও একই ধরনের বিষয়গুলো নতুন করে সামনে এসেছে।
তাই এই মূল্যায়নকে অর্থনীতির বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোর একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা গেলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

