আয়কর ও ভ্যাটের জন্য আলাদা আলাদা শনাক্তকরণ নম্বরের পরিবর্তে একটি একক করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর চালুর প্রস্তাব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এই ব্যবস্থায় একটি নম্বরের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়, ব্যয়, ব্যবসায়িক কার্যক্রমসহ করসংক্রান্ত সব তথ্য এক জায়গা থেকে পাওয়া সম্ভব হবে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বেশ কিছু সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। এর মধ্যে অন্যতম হলো আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডারের আওতায় আনা।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ব্যক্তির জন্য ইলেকট্রনিক কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) চালু রয়েছে। আইএমএফের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এসব আলাদা নম্বরের পরিবর্তে একটি সমন্বিত শনাক্তকরণ নম্বর চালু করা হতে পারে।
আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই আয়কর ও ভ্যাটের পৃথক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে আসছে। তবে বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকায় এতদিন এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি এনবিআরও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করা। স্বাধীনতার পর এটিই সর্বোচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় এবারের লক্ষ্য প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার পর এবার আদায় বাড়াতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এনবিআর। এ লক্ষ্য পূরণে কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও তথ্যভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিবসহ সংস্থাটির আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে একক কর শনাক্তকরণ নম্বর চালুর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত এক এনবিআর কর্মকর্তা জানান, আইএমএফের প্রস্তাবটি নিয়ে এনবিআরে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়েও অবহিত করা হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এনবিআরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একক শনাক্তকরণ নম্বর চালু হলে একজন করদাতার আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট রিটার্ন, আমদানি-রপ্তানি তথ্য, উৎসে কর কর্তন, ব্যাংকিং লেনদেনসহ বিভিন্ন তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা পরিচালনা এবং করদাতাদের সেবা উন্নত করা সহজ হবে বলে মনে করছে এনবিআর।
আইএমএফের মতে, বর্তমানে এনবিআরের অন্যতম দুর্বলতা হলো আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের তথ্য পৃথক পৃথক ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকা। ফলে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ কর-প্রোফাইল এক জায়গায় দেখা যায় না। এতে কর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সংস্থাটির প্রস্তাব অনুযায়ী, একক শনাক্তকরণ নম্বর চালু হলে আয়কর, ভ্যাট, কাস্টমসসহ সব ধরনের কর তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনা সম্ভব হবে।
কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা জোরদার এবং তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর (আরজেসি), বাংলাদেশ ব্যাংক, ভূমি নিবন্ধন অধিদপ্তর, আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ দপ্তর, কাস্টমস ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনবিআরের স্বয়ংক্রিয় তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছে।
এ ছাড়া ই-রিটার্ন, ই-পেমেন্ট এবং উৎসে কর কর্তনের তথ্য পুরোপুরি অনলাইনে আনার মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করার প্রস্তাব দিয়েছে আইএমএফ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একক কর শনাক্তকরণ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে করদাতার তথ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

