গ্রীষ্মের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চাহিদা এখন প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন না থাকায় তৈরি হচ্ছে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে লোডশেডিংয়ের ওপর, যা দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
শহরাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম হলেও মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি অনেক বেশি উদ্বেগজনক। বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও কোথাও দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে। তীব্র গরমে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।
চলতি মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তাদের হিসাব অনুযায়ী, চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই চাহিদা মেটাতে গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো প্রয়োজন। তবে জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ে পল্লী বিদ্যুতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বরাদ্দ না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সংকট এবং কিছু কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যদিও এরই মধ্যে কয়েকটি কেন্দ্র আবার উৎপাদনে ফিরেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তাদের মতে, এতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার কথা।
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহরুল ইসলাম বলেন, “লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার কারণ মূলত কয়লাভিত্তিক দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট (মেশিন) রক্ষণাবেক্ষণে ছিল। এর মধ্যে আদানির একটি ও রামপালের দুটি ইউনিট রয়েছে। বর্তমানে তিনটি ইউনিটই উৎপাদনে এসেছে। তবে এসএস পাওয়ার ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সংকট রয়েছে। এর বাইরে যুদ্ধের কারণে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত জ্বালানির সংস্থান নেই। পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোও উৎপাদন সংকটে রয়েছে। এসব কারণেই মূলত বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছি।”
সরকারি তথ্যমতে, বিদ্যুৎ ঘাটতি অব্যাহত থাকায় লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিপিডিবির হিসাবে, গতকাল দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। আর সন্ধ্যার পিক সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে।
অন্যদিকে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট। এতে ৪১৮ মেগাওয়াট ঘাটতি পূরণে লোডশেডিং করতে হয়। এছাড়া গতকাল সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ঘণ্টাভিত্তিক চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধানে সর্বনিম্ন প্রায় ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করা হয়েছে।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবারও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। সেদিন ঘণ্টাভিত্তিক চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধানে সর্বনিম্ন সাড়ে ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছিল।
বিপিডিবি সূত্র জানায়, রক্ষণাবেক্ষণে থাকা কয়লাভিত্তিক তিনটি ইউনিট ইতোমধ্যে আবার উৎপাদনে ফিরেছে। এর মধ্যে গতকাল বিকাল ৫টায় আদানি পাওয়ার থেকে ১ হাজার ৪৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। একই সময়ে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদনের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ার প্লান্ট এবং কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনও কয়লা সংকটে রয়েছে। তবে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়লাবাহী একটি জাহাজ ইতোমধ্যে এসে পৌঁছেছে। শিগগিরই বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোও দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সংকটে ভুগছে। সরকারের কাছে এসব কেন্দ্রের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়া পরিশোধের দাবিতে উদ্যোক্তারা একাধিকবার সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। তাদের দাবি, অর্থ সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, বকেয়ার কারণে মালিকরা ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে পারেননি। বর্তমান মজুদ জ্বালানি দিয়ে রেশনিংয়ের মাধ্যমে আগামী মে মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

