বাসাবাড়ির বিদ্যুতের দাম ব্যবহারভেদে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০ দশমিক ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। একই সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের জন্য তিনটি বিকল্প প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে সরকারি ভর্তুকি প্রায় ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কমে আসতে পারে। তবে প্রান্তিক বা লাইফলাইন পর্যায়ের গ্রাহকদের জন্য কোনো মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়নি।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাড়তে থাকা ব্যয় সামাল দিতে পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয় সরকার। এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগ এই প্রস্তাবগুলো তৈরি করে। একই উদ্দেশ্যে ৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সুপারিশ দেবে।
আইন অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের এখতিয়ার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। প্রচলিত প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রথমে বিইআরসিতে প্রস্তাব দেয়। এরপর কমিশন তা যাচাই-বাছাই করে গণশুনানির আয়োজন করে এবং চূড়ান্তভাবে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তখন প্রতি ইউনিটের গড় খুচরা মূল্য দাঁড়ায় ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। একই সময়ে পাইকারি দাম ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।
বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ স্বাক্ষরিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহ চাপে পড়ে। এতে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায় এবং ভর্তুকির চাপও বৃদ্ধি পায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ অব্যাহত রাখে। উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানিও চালু থাকে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়, যাতে বেসলোড উৎপাদন ব্যাহত না হয়। তবে এসব ব্যবস্থার কারণে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে এই চাপ আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
পাইকারি বিদ্যুতের দামের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগ তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমান ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ৫০ পয়সা বাড়িয়ে ৭ টাকা ৫৪ পয়সা করলে ভর্তুকি কমতে পারে প্রায় ৫ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। এক টাকা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হলে ভর্তুকি কমার সম্ভাবনা প্রায় ১০ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। আর এক টাকা ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৪ পয়সা করলে ভর্তুকি সাশ্রয় হতে পারে সর্বোচ্চ প্রায় ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।
খুচরা পর্যায়ে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাবেও বলা হয়েছে, নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য ০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন স্তরে কোনো মূল্যবৃদ্ধি করা হবে না। তবে অন্যান্য আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ব্যবহারভেদে ধাপে ধাপে ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করেছে। শ্রীলঙ্কা আবাসিক খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, শিল্প খাতে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে। দেশটি পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দামও প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরে জ্বালানির মূল্য সরাসরি ট্যারিফে যুক্ত থাকায় বিদ্যুতের দাম প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ খাত পর্যালোচনার জন্য একটি কারিগরি মিশন পাঠায়। দুই সপ্তাহব্যাপী ওই মিশন বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে। তাদের সুপারিশে বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো এবং তিন বছর মেয়াদি একটি রোডম্যাপ তৈরির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিয়ে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি ব্যয়ের চাপও ক্রমেই বাড়ছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু মার্চ ও এপ্রিলে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতেই অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। জ্বালানি তেলে দৈনিক গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি বাজেটে ভর্তুকির জন্য ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আরও প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

