দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। একদিকে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে গবেষণায় স্থবিরতা—এই দুই সংকটের কেন্দ্রে এখন নেতৃত্বের সক্ষমতা ও দৃষ্টিভঙ্গি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে নিতে হলে উপাচার্যের ভূমিকা শুধু প্রশাসনিক নয়, কৌশলগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে রূপান্তর করতে হবে।
বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যরা প্রশাসনিক জটিলতা সামলাতেই ব্যস্ত থাকেন। একাডেমিক উন্নয়ন, গবেষণা প্রসার বা বৈশ্বিক সংযোগ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পিছিয়ে পড়ে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি না হয়ে বরং পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা জোরদার হয়। এতে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি পেলেও দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকে, যা সরাসরি শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন উপাচার্য (ভিসি) চাই যিনি হবেন মেধাবী শিক্ষাবিদ, গবেষণাবান্ধব, অরাজনৈতিক, সৎ ও দক্ষ প্রশাসক। তিনি শাসক না হয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব হবেন এবং দলীয়করণের বাইরে থেকে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ও গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেবেন। তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার অবদান থাকা জরুরি।
কাঙ্ক্ষিত ভিসির গুণাবলী হবে প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি (PhD) ডিগ্রীধারী এবং গবেষণা ও মানসম্মত প্রকাশনায় সমৃদ্ধ। দলীয় বিবেচনা বা রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে অযোগ্যদের নিয়োগের পরিবর্তে মেধার ভিত্তিতে কাজ করবেন। শিক্ষার্থীদের মতামতের গুরুত্ব প্রদান, আবাসন ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা । বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে অবস্থানের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন পরিচালনা করা। সংক্ষেপে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হবেন এমন একজন অভিভাবক, যিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণামুখী ও সৃজনশীল পরিবেশ তৈরিতে নেতৃত্ব দেবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন কার্যকর উপাচার্যের তিনটি মূল গুণ থাকা জরুরি—গভীর একাডেমিক দক্ষতা, শক্তিশালী প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলার মানসিক দৃঢ়তা। এ তিনটির যেকোনো একটির ঘাটতি থাকলে পুরো প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে গবেষণা অভিজ্ঞতা ছাড়া উপাচার্য হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে বড় একটি প্রশ্ন হচ্ছে—উপাচার্য কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাব বা বাহ্যিক চাপ উপাচার্যের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এতে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি বা গবেষণা তহবিল বণ্টনে স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাভিত্তিক পরিবেশকে দুর্বল করে দেয় এবং যোগ্যতার বদলে আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি করে।
বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। যেমন ভারতের IIT (Indian Institutes of Technology)– এর মতো প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বে থাকেন স্বীকৃত গবেষকরা, যারা আন্তর্জাতিক একাডেমিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়, ফলে গবেষণা সরাসরি অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। এই মডেল দেখায়, সঠিক নেতৃত্ব থাকলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বড় সমস্যা হলো গবেষণায় বিনিয়োগ কম এবং তা ব্যবহারে দক্ষতার ঘাটতি। উপাচার্য যদি গবেষণাকে অগ্রাধিকার না দেন, তাহলে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না বা ফলপ্রসূ হয় না। একইভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যৌথ গবেষণা বা বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো উদ্যোগও সীমিত থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহি। অনেক সময় উপাচার্যদের কার্যক্রম মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা থাকে না। ফলে মেয়াদকালে সাফল্য বা ব্যর্থতার কোনো সুস্পষ্ট পরিমাপ তৈরি হয় না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, পারফরম্যান্স মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ প্রতিবেদন ব্যবস্থা চালু করা গেলে নেতৃত্বের মান অনেকটাই উন্নত হতে পারে।
উচ্চশিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত সংস্কার। উপাচার্য নিয়োগে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, স্বচ্ছ সার্চ কমিটি গঠন, রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং গবেষণাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্গঠন—এই চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক পাঠ্যক্রম এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বিশ্লেষণ বলছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করে তার নেতৃত্বের ওপর। উপাচার্য যদি দূরদর্শী, গবেষণামুখী এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন, তাহলে সীমিত সম্পদ নিয়েও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যেতে পারে। আর যদি নেতৃত্ব দুর্বল হয়, তবে বড় বাজেট বা অবকাঠামো থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তাই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে উপাচার্য নির্বাচন ও ভূমিকা পুনর্বিবেচনা এখন আর বিকল্প নয়, বরং জরুরি প্রয়োজন।