আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় এটি প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বা ২৫ শতাংশ বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্য সামনে রেখে এই বাজেটকে কল্যাণমুখী ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি গড়ার পরিকল্পনা হিসেবে সাজানো হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নতুন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও জ্বালানি সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চলতি বছরের তুলনায় আরও ১ লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনীতিবিদদের মতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ১১টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং দেশীয় ও প্রবাসী শ্রমবাজার সম্প্রসারণ। তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ প্রণোদনা ও সহায়তা কর্মসূচি যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নীতি সহায়তা ও আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নও এই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ও সম্প্রসারিত কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার রোডম্যাপও বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে। এ লক্ষ্যে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প বিকাশ এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আর্থিক খাত পুনর্গঠন, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় টেকসই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রাক্কলিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়। এতে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৪ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সুদ পরিশোধ বাবদ আগামী অর্থবছরে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাজেটের আকার জিডিপির অন্তত ২৫ শতাংশ হওয়া উচিত। সেই বিবেচনায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট অস্বাভাবিক নয়। তবে বাস্তবতা হলো, এত বড় অঙ্কের অর্থ রাজস্ব আকারে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। ফলে বড় অংশই দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা অর্থনৈতিক চাপ বাড়াবে। তার মতে, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বাজেটের আকার সীমিত রাখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
জানা গেছে, আগামী বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ বর্তমান সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জিডিপির ৩১.৪ শতাংশ বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে বেসরকারি খাতে ২৪.৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬.৫ শতাংশ বিনিয়োগ ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে ভর্তুকি খাতেও চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ভর্তুকি কমানোর শর্ত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা, এলএনজিতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সারে ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং খাদ্য সহায়তায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা, যেখানে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে নতুন বাজেট একদিকে যেমন উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখেছে, অন্যদিকে ঋণ নির্ভরতা, রাজস্ব আহরণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।

