চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমদানি-রফতানির সিংহভাগই এই অঞ্চল ঘিরে পরিচালিত হয়, যার প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ বিভাগকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদনমুখী শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বলয়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকেও চট্টগ্রাম এগিয়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, গত এক দশকে চট্টগ্রাম বিভাগের অর্থনৈতিক ইউনিটে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে ঢাকা বিভাগে এ হার ছিল ২৪ শতাংশ।
শুমারি বলছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪০টি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ২৭ হাজার ৬২৯টি। অর্থাৎ ১০ বছরে এখানে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ঘটেছে। এই ইউনিটগুলোর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় এবং ৪০ শতাংশ শহরে অবস্থিত। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগে ২০১৩ সালে অর্থনৈতিক ইউনিট ছিল ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৩৩টি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ লাখ ৬৯ হাজার ২৮৪টিতে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি চট্টগ্রামের তুলনায় অনেক কম।
শিল্প খাতেও চট্টগ্রামের অবস্থান শক্তিশালী। শুমারি অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে মোট ১১ লাখ ২ হাজার উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক ইউনিট গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রামে—প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ৮৪৮টি বা ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে এ সংখ্যা ২ লাখ। এছাড়া রাজশাহীতে ১ লাখ ৪৫ হাজার এবং বরিশালে ৫৮ হাজার ইউনিট গড়ে উঠেছে।
তবে এই বড় শিল্পভিত্তি থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে চট্টগ্রামের অবস্থান দুর্বল। শুমারি বলছে, চট্টগ্রামের উৎপাদন খাতে ২ লাখ ৪০ হাজার ৮৪৮টি ইউনিটের মধ্যে মাত্র ৪ হাজার ৭১৫টি ইউনিট তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছে। শতাংশের হিসাবে এটি মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে এ হার তুলনামূলক বেশি। সেখানে ২ লাখ ইউনিটের মধ্যে ১১ হাজার ৩০০টি ইউনিট তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের আওতায় এসেছে, যা মোটের ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
অন্যান্য বিভাগগুলোর অবস্থাও খুব শক্তিশালী নয়। রাজশাহীতে ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ, রংপুরে ১ দশমিক ১৯ শতাংশ, খুলনায় ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং সিলেটে ১ দশমিক ২৪ শতাংশ ইউনিট তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশাল, যেখানে এ হার মাত্র ১ দশমিক ১৪ শতাংশ।
চট্টগ্রাম বিভাগে উৎপাদনমুখী শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আছেন প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ। দেশের কনটেইনার বাণিজ্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। এত বড় বাণিজ্যিক পরিসর থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তির ব্যবহার কম থাকাকে বড় ধরনের দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামের উৎপাদন কাঠামোর বড় অংশজুড়ে রয়েছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। শুমারি অনুযায়ী, এখানকার মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসা, যা সংখ্যায় প্রায় ১২ লাখ ২৫ হাজার ৫২১টি। কুটির শিল্পের অংশ ৩৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ বা ৭ লাখ ১২ হাজার ২২৮টি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ছোট ও মাঝারি শিল্পে প্রযুক্তি গ্রহণের হার স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে। ফলে চট্টগ্রামের মতো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রে থেকেও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার পিছিয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ২০২১ সালের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে শুমারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে ১০ জনের কম কর্মচারী রয়েছে, সেখানে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার তিন থেকে চার গুণ কম।
উৎপাদনশীলতা, নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং রফতানি বৃদ্ধির জন্য গবেষণা ও উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হলেও চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে এর ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। মাত্র দশমিক ৪ শতাংশ বা প্রায় সাড়ে সাত হাজার ইউনিটে গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কমে গেলে চট্টগ্রামের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়তে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর বিকল্প নয়, এটি একটি মৌলিক প্রয়োজন। তাঁর মতে, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র যদি প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকে, তাহলে তা ডিজিটাল বিভাজনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, অর্থনৈতিক সুযোগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন যদি সমভাবে ছড়িয়ে না পড়ে, তাহলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

