তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে কেন্দ্র করে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা সাজিয়েছে সরকার। খসড়া কৌশলগত কাঠামোয় আইসিটি খাতকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ অগ্রাধিকার। এই খাতে একদিকে বড় ধরনের কর্মসংস্থান, অন্যদিকে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে রেখে এই খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। বুধবার সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন সংক্রান্ত অ্যাডভাইজারি কমিটির বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এটি উপস্থাপন করে। খসড়াটি এখন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। একই সময়ে জিডিপির আকার ৭৪৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইসিটি খাতে বড় কর্মসংস্থান পরিকল্পনা:
খসড়া অনুযায়ী, শুধু তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মোট ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ লাখ কর্মসংস্থান হবে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর খাতে—যেমন সাইবার নিরাপত্তা, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা, সেমিকন্ডাক্টর ও ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র। বাকি ৮ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হবে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইনভিত্তিক কাজের মাধ্যমে।
এ খাতকে এগিয়ে নিতে সবার জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করার পাশাপাশি সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার শিল্পকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্রিল্যান্সার ও প্রযুক্তি পেশাজীবীদের জন্য আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করতে ‘পেপ্যাল’ সুবিধাসহ জাতীয় ই-ওয়ালেট চালুর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
আইসিটির বাইরে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিবছর ২০ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। স্বল্প সময়ে ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ কর্মী প্রস্তুত করা হবে। এ ছাড়া স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি শূন্য পদে ৫ লাখের বেশি জনবল নিয়োগের পরিকল্পনাও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রপ্তানি খাতে পোশাক শিল্পের পাশাপাশি নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যও এতে রয়েছে। ওষুধ, চামড়া, পাদুকা এবং কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ব্লকের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে এবং সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ০.৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে শুল্ক, কর ও রপ্তানি প্রণোদনায় হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন না আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসেবে কোম্পানি নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টা এবং ওয়ার্ক পারমিট ৭ দিনের মধ্যে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল কমার্সিয়াল কোর্ট’ গঠনের প্রস্তাবও এসেছে। পাশাপাশি আমানতকারীদের সুরক্ষায় ‘ডিপোজিট প্রটেকশন অর্ডিন্যান্স’ চালুর কথা বলা হয়েছে।
তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, মৎস্য আহরণ ও জাহাজ নির্মাণসহ সুনীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি)কে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে চলচ্চিত্র, সংগীত, গেমিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনের মতো সৃজনশীল খাত থেকে জিডিপির ১.৫ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাতে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনাও রয়েছে।
পর্যটন খাতের নীতিমালা হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ ধারণা বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে প্রতিটি গ্রাম তাদের ঐতিহ্যবাহী পণ্য ই-কমার্সের মাধ্যমে বাজারজাত করতে পারবে। প্রতিটি জেলার বিশেষ পণ্য ও কুটিরশিল্পকে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার সুপারিশও করা হয়েছে।

