জ্বালানি তেলকে আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়। উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতের প্রায় সব পর্যায়েই এর ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের দামে পরিবর্তন এলেই তার প্রভাব সরাসরি জনজীবনের বিভিন্ন স্তরে পড়ে।
নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় দেশে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। এতে বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্তের প্রভাবে পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন খরচ এবং শিল্প খাতে ব্যয় একযোগে বেড়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে, যা শেষ পর্যন্ত নিম্ন ও মধ্যমআয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে।
গতকাল রবিবার (১৯ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হওয়া নতুন দামে ডিজেলের লিটার ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে অকটেনের দাম ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা, পেট্রলের দাম ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া একই দিনে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজির দামও বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নতুন দাম গতকাল সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রথম ও সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ সব ধরনের যানবাহনের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়, যার ফলে ভাড়া বৃদ্ধির প্রবণতা তৈরি হয়। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা।
এর প্রভাব সরাসরি ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কর্মস্থলে যাতায়াত থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে চাপ তৈরি হচ্ছে। কারণ উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরিবহন ব্যয় যুক্ত থাকে। ফলে চাল, ডাল, সবজি, মাছসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃষি খাতেও এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেচ কাজে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত পাম্প, ট্রাক্টরসহ কৃষি যন্ত্রপাতির খরচ বেড়ে যাবে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা উৎপাদন কমানোর দিকেও যেতে পারেন।
অন্যদিকে শিল্প ও উৎপাদন খাতে জ্বালানির বাড়তি দাম আরও বড় চাপ তৈরি করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার থাকলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে শিল্প কারখানার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারে পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। ফলে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি একাধিক খাতে ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় পড়ে। আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ায় সঞ্চয়ের প্রবণতা কমে যায় এবং আর্থিক চাপ আরও তীব্র হয়। দেশের সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপেই আছে সাধারণ মানুষ। নতুন এই সিদ্ধান্ত সেই চাপকে আরও তীব্র করবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ দামের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি আগেই চাপের মধ্যে রয়েছে। নতুন করে জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বাড়ায় এই চাপ আরও বেড়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার বিষয়টি সরকারের একটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে শুধু সরাসরি জ্বালানি ব্যবহারকারীর খরচই বাড়বে না, বরং যেসব খাতে জ্বালানি ব্যবহৃত হয় সেখানেও দামের চাপ ছড়িয়ে পড়বে।
এর প্রভাব যাতায়াত ব্যয়, পরিবহন টিকিটের দাম, উৎপাদন খাত এবং আমদানি-রপ্তানি শিল্পেও পড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এতে একদিকে ভোক্তা এবং অন্যদিকে উৎপাদক—দু’পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ড. মুজেরী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে থাকলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে সরকার বলছে, এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো আইএমএফের চাপের কারণে নয়, বরং বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং সরকারি তহবিলের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত কোনো নির্বাচিত সরকার মেনে নেবে না এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মসূচি স্বাধীনভাবে নেওয়া হবে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর শর্তের একটি প্রভাব থাকতে পারে। তবে এর চেয়েও বড় কারণ হলো সরকারের বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতি। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বহন করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু দাম বাড়ানোই সমস্যার সমাধান নয়। বরং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন ছিল বলে তিনি মনে করেন। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে স্থানীয় বাজারেও সমন্বয় করে দাম কমানোর আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে তিনি একটি বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, দেশে একবার দাম বাড়লে তা কমানোর নজির খুব কমই দেখা যায়।
এদিকে ভর্তুকি কমানোর উদ্দেশ্যেই দাম বাড়ানো হয়েছে—এমন ধারণা থাকলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই দাম সমন্বয় করা হয়েছে। একই চিত্র এলপি গ্যাস বাজারেও দেখা যাচ্ছে, যেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। বাজারে তদারকির ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে কালোবাজারির অভিযোগও রয়েছে। যদিও সরকার কালোবাজারি দমনের কথা বলছে, তবে বাস্তবে তার কার্যকর প্রয়োগ এখনো দৃশ্যমান নয়।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি এবং ভোক্তা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এ এইচ এম শফিকুজ্জামান মনে করেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নতুন করে শুরু হয়নি; বরং এর চাপ আগেই বাজারে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর আগেই পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার সরাসরি প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর পড়ে। এখন নতুন করে দাম বাড়ায় সেই চাপ আরও তীব্র হয়েছে।
তার মতে, পরিবহন খাতে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের ভাড়া বেড়ে গেছে। এতে দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষের ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অনেকেই বাধ্য হয়ে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচে কাটছাঁট করছেন।
এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, সরকারের পূর্বের প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান সিদ্ধান্তের মধ্যে ব্যবধান থাকায় জনগণের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশে যদি পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকে, তাহলে হঠাৎ করে সংকট তৈরি হলো কীভাবে—এই প্রশ্নই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তিনি আরও জানান, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিও ক্রমেই জটিল হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে পেট্রলপাম্পগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় ও বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে কিছুটা শৃঙ্খলা ছিল, এখন সেখানে চাপ বেড়ে গিয়ে পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এই অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এর মধ্যে রয়েছে বাজারে নিয়মিত ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা, জ্বালানির বিকল্প উৎস ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষি খাতে ভর্তুকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় ভূমিকা।
তিনি আরও বলেন, কেবল সরকার নয়, জনগণেরও সচেতন ভূমিকা জরুরি। জ্বালানির অপচয় কমানো এবং সাশ্রয়ী জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা হলে কিছুটা হলেও চাপ কমানো সম্ভব।

