বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তা বাজারকে সামনে রেখে দেশে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে জাপানের বহুজাতিক গৃহস্থালি ও পার্সোনাল কেয়ার পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লায়ন কর্পোরেশন। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কল্লোল গ্রুপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের মাধ্যমে কোম্পানিটি এখন সরাসরি বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করছে।
১৮৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত লায়ন কর্পোরেশন ২০২২ সালে কল্লোল গ্রুপের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ‘লায়ন কল্লোল লিমিটেড’ নামে গঠিত এই যৌথ প্রতিষ্ঠানে জাপানি কোম্পানিটির মালিকানা ৭৫ শতাংশ।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মিত কারখানাটিতে গত মাস থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে। জাপানি শিল্প-শৃঙ্খলার আদলে নির্মিত আধুনিক এই কারখানায় প্রাথমিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে মামা লেমন ডিশওয়াশিং লিকুইড এবং সিস্টেমা টুথব্রাশ। পর্যায়ক্রমে আরও বিভিন্ন গৃহস্থালি ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কারখানা পরিদর্শনে দেখা গেছে, একতলা আধুনিক স্থাপনাটিতে মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রবেশপথেই প্রদর্শিত হচ্ছে কোডোমো বেবি কেয়ার, ওরাল কেয়ার ও ফেব্রিক ক্লিনিংসহ বিভিন্ন পণ্য।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এই বিনিয়োগের প্রধান লক্ষ্য। একইসঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সহযোগী শিল্পের বিকাশেও এই প্রকল্প ভূমিকা রাখবে বলে তাদের আশা।
লায়ন কল্লোল লিমিটেডের চেয়ারম্যান গো ইচিতানি বলেন, নতুন এই কারখানা বাংলাদেশের প্রতি কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তার ভাষ্য, এর মাধ্যমে মানসম্মত ও উদ্ভাবনী পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা আরও বাড়বে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখবে প্রতিষ্ঠানটি।
১৩০ বছরের বেশি পুরোনো লায়ন কর্পোরেশন বর্তমানে টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, ডিটারজেন্ট, সাবান, স্কিন ও হেয়ার কেয়ার পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে। এছাড়া ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ উৎপাদনেও প্রতিষ্ঠানটির উপস্থিতি রয়েছে।
২০২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির সমন্বিত নিট বিক্রির পরিমাণ ৪০০ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ২ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটিতে ৮ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন।
কল্লোল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি দেশে আসবে এবং স্থানীয় বাজারে পণ্যের মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।
কারখানাটির অপারেশন ডিরেক্টর তাকাশি ওচিয়াই জানান, উৎপাদন ব্যবস্থায় মান নিয়ন্ত্রণ, কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিল্প শৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই কারখানা রপ্তানি বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রায় ৩ দশমিক ৩ হেক্টর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই কারখানায় আধুনিক উৎপাদন লাইন ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। কারখানাটির নকশা ও নির্মাণ করেছে জাপানের শিমিজু কর্পোরেশন।
বর্তমানে এই ফাস্ট মুভিং কনজ্যুমার গুডস বা এফএমসিজি কারখানায় প্রায় ২৭৩ জনের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভবিষ্যতে সেই বিনিয়োগ বাড়িয়ে ১৯ দশমিক ৪১ মিলিয়ন ডলারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এ ধরনের বড় বিনিয়োগ দেশের বাজারে ইতিবাচক বার্তা দেয় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়। জাতীয় নির্বাচনের পর বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহও বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা পড়েছে এবং চলতি বছর বিনিয়োগ প্রবাহ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিএসইজেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিহারু তাগাওয়া বলেন, বর্তমানে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে লায়ন কল্লোলসহ তিনটি কোম্পানি উৎপাদনে রয়েছে। এছাড়া আরও ১২টি প্রতিষ্ঠান জমি ইজারা নিয়েছে এবং কয়েকটি ইতোমধ্যে নির্মাণকাজ শুরু করেছে।
যদিও কোম্পানিটি তাদের বিক্রয় ও প্রবৃদ্ধির নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি, তবে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে হাইজিন ও ফ্যামিলি কেয়ার পণ্যের বাজারে তাদের কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তার ভাষায়, কোডোমো বেবি কেয়ার থেকে মামা লেমন ও সিস্টেমা—সব ধরনের পণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাতে পেরে তারা গর্বিত।

