দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখনো থামার কোনো লক্ষণ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অনেক পরিবারই তিন বেলার পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে পারছে না। যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ প্রায় সব খাতে ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে শিল্প ও উৎপাদন খাতে বাড়তি খরচ।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপ ও রাজস্ব ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে বলে জানা গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায় বাড়াতে ভ্যাটকে প্রধান উৎস হিসেবে নির্ধারণ করছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ভ্যাট বাড়ানো হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে। এতে ব্যবসা ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত চাপ বাড়বে ভোক্তার ওপর।
নব্বইয়ের দশকে দেশে ভ্যাট ব্যবস্থা চালু হয়। তখন এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল এবং সাধারণ মানুষ রাস্তায়ও নেমেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা স্থায়ী হয়। বর্তমানে ভ্যাট পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই ভোক্তারা সরাসরি না জেনেই তা পরিশোধ করছেন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য পূরণে অতীতে হার বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে, যা বাজারে দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভ্যাট বাড়ানো হলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে এবং নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।
তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ থাকলে ২০ টাকার জুসের দাম দাঁড়ায় ২৩ টাকা এবং ১৫০ টাকার স্যান্ডেল ১৭২ টাকায় পৌঁছায়। ফলে ভ্যাটের বোঝা সরাসরি ভোক্তার ওপরই পড়ে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বাজারে খরচের চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দাম আর কমার কোনো লক্ষণ নেই। মৌসুমী সরবরাহ বাড়লেও শাকসবজি ও ফলের দাম স্থিতিশীল হয়নি। এর মধ্যে ভ্যাট বাড়লে সাধারণ মানুষের সংকট আরও গভীর হবে।
এনবিআরের বাজেট সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, যা চলতি বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। এই ব্যয়ের বড় অংশ জোগাড় করতে এনবিআরকে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ভ্যাট থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, আয়কর থেকে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা এবং শুল্ক থেকে ৬৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে ভ্যাটকেই সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎস হিসেবে ধরা হচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান সম্প্রতি এক সভায় জানান, ভ্যাটের আওতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তার মতে, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখেরও কম, অথচ অর্থনীতির বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত। তবে এনবিআরের বাজেট প্রস্তুত কমিটির এক কর্মকর্তা জানান, এসব হিসাব এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এগুলোতে পরিবর্তন আসতে পারে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়লেও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। এতে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয় এবং মাঝপথে উন্নয়ন প্রকল্প কাটছাঁট করতে হয়, যা অর্থনীতির ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এনবিআরের তিনটি প্রধান খাত—ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক—কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এই সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে ভ্যাট খাতে ঘাটতি হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন যখন চাপে রয়েছে, তখন ভ্যাট বাড়ানো হলে ব্যবসা আরও সংকটে পড়বে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং বাজারে এর প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, রাজস্ব বাড়াতে ভ্যাটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

