বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের বাজেট সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি অর্থবছর প্রায় শেষের পথে থাকলেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে মাত্র ৭৫০ মিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই এ ঘাটতি আরও চাপ তৈরি করছে দেশের বাজেটে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকির চাপও অনেক বেড়েছে। এতে বাজেট ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে তীব্র অর্থ সংকট।
সূত্র জানায়, নিয়মিত বাজেট সহায়তার বিষয়ে আলোচনায় থাকা অন্তত দুইটি বড় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা আপাতত আলোচনা স্থগিত রেখেছে। তারা এখন সাধারণ ঋণের বদলে জরুরি ভিত্তিতে ব্যালান্স অব পেমেন্টস সহায়তার মাধ্যমে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত একমাত্র নিশ্চিত বাজেট সহায়তা দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রস্তাবটি আগামী মে মাসের শুরুতে তাদের বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পেলে আগামী মাসের শেষ দিকে এডিবি প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা ঢাকায় আসার সময় ঋণ চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানিয়েছে, যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে এডিবির কাছ থেকে আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা চাওয়ার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংককে দেওয়া ২৫০ মিলিয়ন ডলারের নিয়মিত বাজেট সহায়তার প্রস্তাবটি তারা নাকচ করেছে। এখন সরকার সংস্থাটির কাছে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা চাচ্ছে, যাতে যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি হওয়া বাজেট ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ করা যায়।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) এদিকে চলতি অর্থবছরে পরিকল্পিত বাজেট সহায়তা কর্মসূচি স্থগিত করে আগামী অর্থবছরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। ফলে চলতি বছরে তাদের কাছ থেকে কোনো সহায়তা আসছে না। তবে ২৯ এপ্রিল জাইকার একটি দল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসবে। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি আঞ্চলিক তহবিল থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-এর সঙ্গে ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নির্ভর করবে সহ-অর্থায়নকারী পক্ষের সম্মতির ওপর। ফলে চলতি অর্থবছরের মধ্যে এই অর্থ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় অংশ নেন। সেখানে চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাওনা দুই কিস্তির প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার দ্রুত ছাড়ের অনুরোধ জানানো হয়। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে আলাদাভাবে ১ বিলিয়ন ডলার করে জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
দেশে ফিরে উপদেষ্টা জানান, সব উন্নয়ন অংশীদারই বর্তমান সংকটে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কতটুকু সহায়তা নিশ্চিত হয়েছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বাজেট সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক ও ‘কমফোর্ট জোন’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
তার মতে, সংকট মোকাবিলায় সরকারি ব্যয় কমানো এখন অত্যন্ত জরুরি। এতে আমদানি কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও হ্রাস পাবে। পাশাপাশি বিনিময় হারকে আরও নমনীয় রাখা এবং দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ব্যবধান না রাখা উচিত বলেও তিনি মত দেন।

