বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা আবার চালু করতে শিগগিরই বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আজ শনিবার ঢাকার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত পৃথক প্রাক্-বাজেট আলোচনায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আলোচনায় অংশ নেন সংবাদপত্রের সম্পাদক, টেলিভিশন চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সদস্যরা।
সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্টভাবে বলেন, সরকার ঘাটতি মেটাতে নতুন করে টাকা ছাপানো বা স্থানীয় উৎস থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পথে হাঁটবে না। সম্প্রতি সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নিয়েছে—এমন খবরকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে সুদের হার বেড়ে যায় এবং এতে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। তাই সরকার এ ধরনের নীতি থেকে সরে এসে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়।
সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান দাবি করেছিলেন, মার্চ মাসে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। তাঁর মতে, এই অর্থ ‘হাই-পাওয়ার মানি’ হিসেবে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে এ বিষয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপানোর তথ্য সঠিক নয়। তিনি ব্যাখ্যা করে জানান, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে একটি “ওয়েজ অ্যান্ড মিনস” হিসাব রয়েছে, যার সীমা ১২ হাজার কোটি টাকা।
সরকারি লেনদেনের কারণে এই হিসাবে প্রতিদিন ওঠানামা হয়। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় ওই হিসাবে স্থিতি ছিল ১৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা বর্তমানে কমে ১১ হাজার ১০৩ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। তিনি এটিকে স্বাভাবিক ও অস্থায়ী আর্থিক সমন্বয় বলে উল্লেখ করেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ মূল্যস্ফীতি বাড়ায় এবং বেসরকারি খাতের ওপর চাপ তৈরি করে। তাই সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না, যা অর্থনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে অর্থনৈতিক সুবিধা সীমিত কিছু গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই অবস্থা থেকে বের হয়ে অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক করতে চায়।
প্রাক্-বাজেট আলোচনায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অগ্রাধিকারের বিষয়ও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিলে তা পরিবার ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে।
শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক ভারসাম্যের ভিত্তিতেই বাজার পরিচালিত হওয়া উচিত।
এসএমই, স্টার্টআপ, কুটিরশিল্প ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে আগামী দিনের কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে সরকার। ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তার মাধ্যমে স্থানীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
একই সঙ্গে ক্রীড়া, সংস্কৃতি, নাটক, সিনেমা ও সংগীত খাত দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল উল্লেখ করে এসব খাতেও নতুন গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দেন অর্থমন্ত্রী।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত না হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানো কঠিন হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুই ভাগে বিভক্ত করার বিষয়ে একটি কমিটি কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, টাকার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে বলে স্বীকার করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত উৎপাদন ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে না। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানেও।

