ঢাকায় জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) অর্থায়িত বড় কয়েকটি অবকাঠামো প্রকল্পে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছরের স্থবিরতা কাটতে শুরু করেছে। রাজধানীর মেট্রোরেল দুটি লাইন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী বন্দর প্রকল্পে এখন নতুন করে কাজের গতি ফিরেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা বলছেন, ঠিকাদার নিয়োগ ও অপারেটর চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়া আবারও সক্রিয় হয়েছে। এর ফলে বড় এসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানিয়েছে, এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে দরপত্র ও ঠিকাদার নির্বাচনের প্রক্রিয়া আবারও গতি পেয়েছে।
২০১৯ সালে একনেকে অনুমোদিত এই দুটি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল যথাক্রমে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা এবং ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। তবে ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দর প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় ব্যয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে প্রকল্প দুটি দীর্ঘ সময় দরপত্র পর্যায়েই আটকে ছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিলে জাইকা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু সমাধান না হওয়ায় অচলাবস্থা বজায় থাকে।
ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। এমআরটি লাইন-১ এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ (সিপি-০২ ও সিপি-০৫) এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের কাছাকাছি। একই সঙ্গে জাইকা ও জাপানি দূতাবাস দ্রুত চুক্তি কার্যকরের অনুরোধ জানিয়েছে। প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সারওয়ার উদ্দীন খান জানান, দরপত্র প্রক্রিয়া বর্তমানে সক্রিয় আছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে ডিপোর কাজ ইতোমধ্যে ৭৭ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। উড়াল অংশ ও মূল লাইন নির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রস্তুত অবস্থায় থাকলেও অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব জাপানি একটি কনসোর্টিয়ামকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও অপারেটর চূড়ান্ত হলেও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে দুই পক্ষ এখনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, জাপানি কনসোর্টিয়াম নতুন প্রস্তাব দিয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে এখনো আলোচনা চলছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্প্রতি জানান, থার্ড টার্মিনাল ১৬ ডিসেম্বর অথবা নতুন বছরের শুরুতে উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত শিনিচি সাইদা এসব প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ সময়ের স্থবিরতা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর ছিল এবং এখন তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় থাকলেই এসব বড় প্রকল্পের সুফল পাওয়া সম্ভব।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাইকা অর্থায়িত মাতারবাড়ী বন্দর প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রকল্পটিতে নতুন করে গতি এসেছে।
জাইকা অর্থায়িত এসব মেগা প্রকল্প দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তায় থাকলেও এখন ধীরে ধীরে সেগুলো আবার বাস্তবায়নের পথে ফিরছে। মেট্রোরেল, বিমানবন্দর টার্মিনাল এবং বন্দর—সব মিলিয়ে দেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

