বাংলাদেশের পেইন্ট শিল্প বর্তমানে একাধিক চাপের মুখে রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা এবং স্থানীয়ভাবে আরোপিত নতুন করনীতি—সব মিলিয়ে শিল্পটি এক জটিল সংকটে পড়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু ব্যবসায়িক মুনাফাকেই নয়, বরং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অবকাঠামোর টেকসই ব্যবস্থাপনাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশ পেইন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ)-এর সভাপতি এবং বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালক ও প্রধান অপারেটিং কর্মকর্তা মঈন হাবিব চৌধুরী বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি একাধিক দিক থেকে চাপ তৈরি করছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্পূরক শুল্ক।”
পেইন্ট শিল্প সরাসরি নির্মাণ, আবাসন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই খাতগুলোর যেকোনো ধীরগতি সরাসরি পেইন্টের চাহিদায় প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি প্রত্যাশার তুলনায় কমে এসেছে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, আবাসন নির্মাণ এবং বেসরকারি নির্মাণ কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা গেছে।
এর প্রভাব সরাসরি পেইন্ট শিল্পে পড়েছে। চাহিদা স্থবির হয়ে পড়ায় অনেক কোম্পানি কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারছে না। কিছু ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি শূন্যের কাছাকাছি, আবার কোনো কোনো বছর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিও দেখা গেছে। শিল্প নেতারা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে স্থায়ী ব্যয় যেমন বেতন, উৎপাদন খরচ, লজিস্টিক ও আমদানি ব্যয় বাড়লেও বিক্রি একই হারে বাড়ছে না। ফলে লাভজনকতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।
শিল্প নেতাদের মতে, বর্তমানে পেইন্ট খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক। চৌধুরী জানান, এই শুল্কের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০১০ সালের ১০ জুন থেকে এক বছর মেয়াদে প্রথমবার এটি আরোপ করা হয়। পরে এটি কমিয়ে ৫ শতাংশে আনা হয় এবং ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ পর্যন্ত সেই হার বহাল ছিল।
পরবর্তীতে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এটি সরবরাহ পর্যায়ে ৫ শতাংশ ছিল। এরপর ৯ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে আবার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়, যা এখনো কার্যকর রয়েছে। শিল্প নেতারা মনে করেন, এই ধরনের কর সাধারণত বিলাসপণ্যের ওপর আরোপ করা হয়। কিন্তু পেইন্ট কোনো বিলাসপণ্য নয়। চৌধুরীর ভাষায়, “পেইন্ট একটি মৌলিক সুরক্ষা উপকরণ। এটি ভবন, সেতু, শিল্পকারখানা এবং অবকাঠামোকে দীর্ঘস্থায়ী করে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেইন্ট ব্যবহারের হার কমে গেলে ভবন ও অবকাঠামোর ক্ষয় দ্রুত বাড়ে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ভবিষ্যতে অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে আর্দ্রতা, বর্ষা এবং লবণাক্ত আবহাওয়া দ্রুত অবকাঠামোর ক্ষয় ঘটায়, সেখানে পেইন্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক উপাদান।
শিল্পের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সম্পদের আয়ু কমে গেলে অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির প্রায় ১ থেকে ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এটি একটি বড় অঙ্ক, যা উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত।
পেইন্ট উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বড় অংশ আসে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প থেকে। এর ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ সরবরাহ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নের কারণে কাঁচামালের দাম ও প্রাপ্যতা—দুটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশে আমদানিনির্ভর শিল্প হিসেবে পেইন্ট খাত সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে।
শিল্প সূত্রে জানা গেছে, কাঁচামালের দাম গড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সলভেন্ট-ভিত্তিক উপকরণের ক্ষেত্রে, এই বৃদ্ধি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার অস্থিরতা।
খরচ বাড়ায় কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। কিন্তু এতে নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে—চাহিদা কমে যাওয়ার ঝুঁকি। পেইন্ট শিল্পে সাধারণত নির্মাণ মৌসুমে চাহিদা বাড়ে। কিন্তু উচ্চ দামের কারণে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রং করার কাজ পিছিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বিক্রি কমে যাচ্ছে, যা আবার উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। এই চক্র শিল্পের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। শিল্প নেতাদের মতে, এটি একটি “মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট”, যেখানে একটি সমস্যা পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশে পেইন্ট ব্যবহার অনেক কম। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু পেইন্ট ব্যবহার মাত্র ১.৫ থেকে ১.৬ কেজি। তুলনায়, ভারতে এবং শ্রীলঙ্কায় এটি ৩ কেজির বেশি। Association of Southeast Asian Nations (ASEAN) অঞ্চলে গড় ব্যবহার ৭–৮ কেজি। চীনে প্রায় ১৪–১৫ কেজি এবং উন্নত দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে ২০ কেজিরও বেশি। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশ এখনো কাঠামোগতভাবে কম ব্যবহারকারী বাজার। শিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি উন্নয়ন ও সচেতনতার ঘাটতিরও প্রতিফলন।
বাংলাদেশ পেইন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের আওতায় থাকা ৩৪টি কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে ২৮টি সক্রিয় রয়েছে। শিল্প নেতারা সতর্ক করেছেন, বর্তমান চাপ অব্যাহত থাকলে ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলো বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। এতে কর্মসংস্থান কমবে, সরবরাহ চেইন দুর্বল হবে এবং শিল্পে বড় কোম্পানির আধিপত্য বাড়বে।
সরকারের জন্য সম্পূরক শুল্ক স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব আয় বাড়াতে সহায়তা করছে। কিন্তু শিল্প নেতারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি উল্টো ফল দিতে পারে। কারণ, চাহিদা কমে গেলে বিক্রি কমে যায়। ফলে ভ্যাট, করপোরেট ট্যাক্স এবং অন্যান্য রাজস্বও কমে যেতে পারে। চৌধুরীর মতে, “শিল্প যদি বড় হয়, সরকারের আয়ও বাড়ে। কিন্তু শিল্প সংকুচিত হলে মোট রাজস্ব কমে যায়।”
শিল্পটি সম্পূর্ণ শুল্ক প্রত্যাহার না চাইলেও ধাপে ধাপে কমানোর দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, হঠাৎ পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে হ্রাস করলে বাজার স্থিতিশীল থাকবে। এতে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে, চাহিদা বাড়বে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেইন্ট শুধু একটি শিল্প পণ্য নয়, এটি জাতীয় অবকাঠামোর স্থায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ভবনের আয়ু বাড়ায়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমায় এবং শহরের পরিবেশগত মান উন্নত করে। কিছু দেশে নিয়মিত পুনরায় রং করা বাধ্যতামূলক বা উৎসাহিত করা হয়, যাতে অবকাঠামো সুরক্ষিত থাকে।
বাংলাদেশের পেইন্ট শিল্প এখন এক বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে—অর্থনৈতিক ধীরগতি, বৈশ্বিক কাঁচামাল সংকট এবং অভ্যন্তরীণ করনীতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতি সহায়তা ছাড়া এই খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। শিল্প নেতাদের আহ্বান, এমন নীতি গ্রহণ করা দরকার যা শিল্পকে চাপ না দিয়ে বরং দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। ধাপে ধাপে সম্পূরক শুল্ক পুনর্বিবেচনা বা হ্রাস করা হলে এই খাত আবারও অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

