দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখনো অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে পাওয়া এবং বিচ্ছিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে নীতি প্রণয়ন, বাজেট পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সিদ্ধান্তে তৈরি হচ্ছে সময়ের ব্যবধান ও অনিশ্চয়তা। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
‘প্ল্যাটফর্মভিত্তিক পরিসংখ্যান সেবা সক্ষমতা বৃদ্ধি (২০২৪-২০২৮)’ প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হচ্ছে একটি সমন্বিত পরিসংখ্যান তথ্যভান্ডার (আইএসডিডব্লিউ)। এই প্ল্যাটফর্ম চালু হলে দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি আরও সময়োপযোগী ও সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিবিএসের মতে, দেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তথ্যের বিচ্ছিন্নতা। জনগণনা, বিভিন্ন জরিপ এবং প্রশাসনিক তথ্য আলাদা আলাদা সিস্টেমে সংরক্ষিত হচ্ছে। এসব ডেটার ফরম্যাটেও নেই একরূপতা।
অনেক ক্ষেত্রে তথ্য আদান-প্রদান এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হওয়ায় দ্রুত সমন্বিত পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে জেন্ডার, যুব, স্থানীয় অর্থনীতি এবং জলবায়ু-সংক্রান্ত সূচকের চাহিদা বাড়ায় এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নতুন সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম চালু হলে বিভিন্ন উৎসের তথ্য এক জায়গায় এনে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হবে। এতে জনগণনা, জরিপ ও প্রশাসনিক ডেটা একত্রে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভুল অর্থনৈতিক সূচক তৈরি করা যাবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অর্থনীতি খাতের তথ্যের পাশাপাশি মোবাইল ডেটা ও স্যাটেলাইটভিত্তিক জিওস্পেশাল তথ্য বিশ্লেষণ করাও সহজ হবে। ফলে অর্থনীতির পরিবর্তন প্রায় বাস্তব সময়ের কাছাকাছি পর্যবেক্ষণ করার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। নতুন ব্যবস্থায় থাকবে—
- উন্নত ড্যাশবোর্ড ব্যবস্থা
- অনলাইন ডেটা অ্যাকসেস
- গবেষকদের জন্য সীমিত মাইক্রোডেটা ব্যবহারের সুযোগ
- ডেটা নিরাপত্তায় এনক্রিপশন ও অ্যানোনিমাইজেশন ব্যবস্থা
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেছেন, নির্দেশনাভিত্তিক তথ্য তৈরির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে বাস্তব ও নির্ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে চায় সরকার। তার মতে, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিবিএসকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও শক্তিশালী করা জরুরি, এবং এই প্রকল্প সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
প্রকল্পটি চারটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে থাকবে পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন। দ্বিতীয় ধাপে ডেটা প্ল্যাটফর্ম ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপন করা হবে। তৃতীয় ধাপে পাইলট কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। চূড়ান্ত ধাপে পুরো সিস্টেম চালু করে বিবিএসের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করা হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণ, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিবিএস জানিয়েছে, এই উদ্যোগ জাতীয় পরিসংখ্যান উন্নয়ন কৌশল এবং ই-গভর্নমেন্ট পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এটি জাতিসংঘের পরিসংখ্যান নীতিমালা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পর্যবেক্ষণ কাঠামোর সঙ্গেও মিল রেখে বাস্তবায়ন করা হবে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রস্তুতিও সহজ হবে। এছাড়া বিশ্বব্যাংক সহায়তাপ্রাপ্ত একটি প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ডেটা সেন্টার উন্নয়ন, জিআইএস ল্যাব এবং সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি আইএসডব্লিউ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করবে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, দীর্ঘদিনের ডেটা বিচ্ছিন্নতার সমস্যা দূর হলে নীতিনির্ধারকেরা একই প্ল্যাটফর্ম থেকে সমন্বিত তথ্য পাবেন, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করবে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তিগত কাঠামো নয়, ডেটা গভর্ন্যান্স, নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একজন সাবেক পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এটি নিজস্ব সক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাই শুরু থেকেই মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

