বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দিতে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন অবস্থান তুলে ধরতে যাচ্ছে। সরকারের তৈরি অবস্থানপত্রে তিনটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগামী ২৯ এপ্রিল জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটির ভার্চুয়াল শুনানিতে বাংলাদেশ তিন বছরের সময় বাড়ানোর আবেদন জানাবে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের নভেম্বরেই এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তবে ঢাকা চাইছে এই সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হোক। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রস্তুতিতে বড় ঘাটতি, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সম্পন্ন না হওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতার কারণে এই সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুর রহিম খান জানান, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সম্পর্কিত যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবেও বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থির হয়ে পড়েছে, যা বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সরকারের অবস্থানপত্রে বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের জন্য যেসব কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তার অনেকটাই এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ঝুঁকি রয়ে গেছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, আর্থিক খাতে ঝুঁকি এবং নীতি বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতিও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ একা নয়—নেপালও একই ধরনের পরিস্থিতিতে জাতিসংঘে সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি এলডিসি দেশ লাও পিডিআর-ও চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর উত্তরণের তালিকায় রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ও নেপাল উভয়ই ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় চেয়েছে। সরকারের মতে, আঞ্চলিক এই বাস্তবতা বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি আগামী ২৯ এপ্রিল শুনানি শেষে একটি সুপারিশ তৈরি করবে। এরপর তা জুনে জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে পাঠানো হবে। পরবর্তী ধাপে সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে (UNGA) বিষয়টি তোলা হবে। সেখানেই ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর আবেদন গ্রহণ করা হবে কি না।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনও উত্তরণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা ধাক্কা অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে জলবায়ু ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সংকট, কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মূল্যস্ফীতিসহ একাধিক চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২২ অর্থবছরের ৭.১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ অর্থবছরে ৩.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি আয় বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বেড়েছে।
বিনিয়োগও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ৫.১ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২.৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এছাড়া ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়েছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নারীদের ওপর।
অর্থনৈতিক খাতে অনাদায়ী ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০.৮ শতাংশে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৮ শতাংশ, আর ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে কর রাজস্বের ৩৬ শতাংশ। রপ্তানি টানা আট মাস ধরে কমছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য অস্থিরতা ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিও চাপ বাড়াচ্ছে। জাতিসংঘের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এলডিসি সুবিধা হারালে বাংলাদেশ বছরে ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেছেন, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহায়তা কমে যাওয়া, জলবায়ু ঝুঁকি এবং জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও সময় পাওয়া গেলে একটি টেকসই ও ঝুঁকিমুক্ত উত্তরণ সম্ভব হবে।

