চলতি বিপণন মৌসুমে বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হলেও আগামী ২০২৬-২৭ মৌসুম নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদ (আইজিসি)। সংস্থাটির মতে, সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ অনিশ্চয়তা এবং কৃষকদের চাষাবাদ পরিকল্পনায় পরিবর্তনের কারণে আগামী মৌসুমে বৈশ্বিক খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ওয়ার্ল্ড-গ্রেইন ডটকমে প্রকাশিত আইজিসির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে গম ও ভুট্টাসহ প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বাড়বে। এতে মোট উৎপাদন দাঁড়াতে পারে ২৪৭ কোটি ৪০ লাখ টনে, যা হবে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গম উৎপাদন প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ৮৪ কোটি ৫০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ৭ শতাংশ বাড়তে পারে এবং মোট উৎপাদন দাঁড়াতে পারে ১৩২ কোটি ৪০ লাখ টনে। এটিও নতুন রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে এ ইতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও আগামী মৌসুম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইজিসি। সংস্থাটি বলছে, উচ্চমূল্যের কারণে অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারেন। এতে ফলনের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে দক্ষিণ গোলার্ধের বিভিন্ন অঞ্চলে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইজিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বৈশ্বিক খাদ্যশস্য উৎপাদন কমলেও মোট সরবরাহ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকবে। ওই সময়ে মোট উৎপাদন হতে পারে প্রায় ২৪১ কোটি ৪০ লাখ টন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের চাহিদাও বাড়তে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। টানা চতুর্থ বছরের মতো ব্যবহার বাড়লেও এর গতি আগের বছরের তুলনায় কিছুটা ধীর হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে গম ও ভুট্টার বাণিজ্য প্রায় ৪৪ কোটি ৮০ লাখ টনের মধ্যে স্থিতিশীল থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সয়াবিন খাতে আশাবাদী চিত্র তুলে ধরেছে আইজিসি। বড় উৎপাদনকারী দেশগুলোতে চাষের জমি বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে আগামী মৌসুমে সয়াবিন উৎপাদনে নতুন রেকর্ড হতে পারে। ২০২৬-২৭ মৌসুমে বৈশ্বিক সয়াবিন উৎপাদন দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৪ কোটি ১০ লাখ টনে, যা চলতি বছরের তুলনায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন বেশি। শুধু উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন বাণিজ্যও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। আইজিসির হিসাবে, আগামী মৌসুমে সয়াবিনের বৈশ্বিক লেনদেন ১৯ কোটি ১০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অধিকাংশ শস্য ও তৈলবীজের দাম বাড়তির দিকেই রয়েছে। আইজিসি গ্রেইনস অ্যান্ড অয়েলসিডস প্রাইস ইনডেক্স গত মাসের তুলনায় ১ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চালের দাম, যা এক মাসে প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বার্ষিক হিসাবে বৈশ্বিক শস্য ও তৈলবীজ মূল্যসূচক এখন ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে সয়াবিনের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশ এবং বার্লির দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে শস্য উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সারের বাড়তি দাম আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ গম ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানি করে থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা বাড়লে দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাল ও গমের আন্তর্জাতিক দাম বাড়তে থাকলে স্থানীয় বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

