শেয়ারবাজারের ব্লক মার্কেটে অস্বাভাবিক লেনদেন ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে বেসরকারি খাতের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, বড় অঙ্কের শেয়ার হাতবদলের মাধ্যমে ব্যাংকটির মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এতে বিতর্কিত সাবেক মালিকদের ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
একসময় চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ-এর নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের প্রভাবমুক্ত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নিয়োগ করা স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের কারোরই ব্যাংকে শেয়ার মালিকানা নেই।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকটির অন্তত সাড়ে আট কোটি শেয়ার ব্লক মার্কেটে লেনদেন হয়েছে, যা মোট শেয়ারের প্রায় ৮ শতাংশ। মাত্র চার মাসে এত বড় অঙ্কের শেয়ার হাতবদলকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
শুধু এপ্রিলের প্রথম ১৯ দিনেই প্রায় তিন কোটি ১০ লাখ শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সীমিত সংখ্যক বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে বড় পরিমাণ শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, যা পরিকল্পিত শেয়ার সংগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এই শেয়ার সংগ্রহের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হতে পারে পরিচালনা পর্ষদে প্রবেশ। কারণ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নীতিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার থাকতে হয়। এ হিসাবে সাম্প্রতিক লেনদেনের মাধ্যমে অন্তত চারজন শেয়ারধারী পরিচালক নির্বাচনের পথ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অর্ডিন্যান্স’ সংশোধনের মাধ্যমে নতুন করে যুক্ত হওয়া ধারা ১৮(ক) পুনর্গঠনাধীন ব্যাংকগুলোতে সাবেক মালিকদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার একটি আইনি সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই আইন পাসের পর থেকেই ব্যাংকটির মালিকানা নিয়ে গুঞ্জন বাড়তে থাকে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, অতীতে যেসব উদ্যোক্তা ব্যাংকটির পর্ষদে থেকে অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগে বিতর্কিত হয়েছেন, তারা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে ফিরলে তা ব্যাংকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে আমানতকারীদের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের মতো অনিয়মের সুযোগ কম থাকবে বলেও তিনি মত দেন।
ডিএসই’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্লক মার্কেটে বড় অঙ্কের লেনদেন নিজে কোনো অপরাধ নয়। তবে অস্বাভাবিক মূল্য বা বিধিবহির্ভূত লেনদেন হলে তা তদন্ত করা হবে। অন্যদিকে বিএসইসি জানিয়েছে, তাদের সার্ভেইল্যান্স বিভাগ পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্লক মার্কেটে বড় লেনদেনের এই প্রবণতা আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক-এর মালিকানা ও পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিতে পারে। তবে এটি বাস্তবে সাবেক মালিকদের প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে দিচ্ছে কি না—তা নির্ভর করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের ওপর।
সিভি/কেএইচ

