দেশে চলতি করবর্ষে প্রায় সাড়ে ৪২ লাখ করদাতা আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের বার্ষিক আয়–ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) রিটার্ন দাখিল করেছেন। তবে দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টিআইএনধারী রয়েছেন। সেই হিসাবে প্রায় ৭৮ লাখ ব্যক্তি এখনও রিটার্ন জমা দেননি।
কর কর্মকর্তাদের ধারণা, এদের বড় একটি অংশের করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দেননি। কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পর গত ৩১ মার্চ রিটার্ন জমার সময়সীমা শেষ হয়েছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, বছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি আয় হলে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক। তাই বিপুলসংখ্যক টিআইএনধারীর রিটার্ন না দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আয়কর আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে করদাতাদের বিভিন্ন ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। আয়কর আইনের ২৬৬ ধারা অনুযায়ী, রিটার্ন না দিলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। তবে এই জরিমানার সর্বনিম্ন পরিমাণ এক হাজার টাকা। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও রিটার্ন না দিলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ টাকা করে জরিমানা যোগ হতে পারে।
রিটার্ন সময়মতো জমা না দিলে বিভিন্ন কর ছাড় ও কর অবকাশ সুবিধা সীমিত হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সঞ্চয়পত্র বা সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে যে কর রেয়াত পাওয়া যায়, তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন জমা দিলে বকেয়া করের ওপর প্রতি মাসে অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হতে পারে। ফলে সময় গড়ানোর সঙ্গে করের চাপও বাড়ে।
আইনে কর কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা পানির সংযোগ নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট আয়সীমার পর আয়কর রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক। অনেক প্রতিষ্ঠান বেতন–ভাতা দেওয়ার সময় রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র চেয়ে থাকে। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন না দিলে বেতন আটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। কর প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নানা কারণে অনেক টিআইএনধারী রিটার্ন জমা দিতে আগ্রহী হন না।
অনেকের আয় বছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার কম হওয়ায় তাদের কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে না। তবে বিভিন্ন সেবা নিতে রিটার্নের কপি প্রয়োজন হওয়ায় অনেকে শূন্য রিটার্ন জমা দেন। একাংশ করদাতার অভিযোগ, কর দিলেও রাষ্ট্রীয় সেবার মান প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। এ কারণে কর দেওয়ার প্রতি আগ্রহ কমে যায়।
অনেকের ধারণা, একবার কর ব্যবস্থার আওতায় এলে প্রতিবছর জটিলতার মুখে পড়তে হবে। কর–সংক্রান্ত হয়রানির আশঙ্কাও অনেককে নিরুৎসাহিত করে। আয়কর হিসাবের প্রক্রিয়া এখনও অনেকের কাছে জটিল। করমুক্ত আয়, ধাপভিত্তিক করহার, ভাতা, বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত—সব মিলিয়ে সাধারণ করদাতার জন্য হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকে ঝামেলা এড়াতে রিটার্নই জমা দেন না।
বাংলাদেশে ব্যক্তিশ্রেণির করহার ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। আবার তিন কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে সারচার্জও দিতে হয়। অনেকের মতে, করহার তুলনামূলক বেশি হলেও কর রেয়াতের সুযোগ সীমিত। এ কারণেও কর দিতে অনীহা দেখা যায়।

