বাংলাদেশের রাজস্ব নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, নীতিগত সমন্বয়ের অভাব এবং কর কাঠামোর জটিলতাকে বিনিয়োগ পরিবেশের বড় বাধা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও দেশের অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, স্থিতিশীল নীতি, কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং দেশীয়-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না করলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন কঠিন হবে।
গতকাল রোববার রাজধানীর গুলশানের রেনেসাঁ হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য সহায়ক রাজস্বনীতি’ শীর্ষক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট চন্দন সাপকোটা বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব নীতিতে পূর্বানুমানযোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রায়ই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নীতিতে পরিবর্তন আনে বা বাতিল করে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে। তার ভাষ্য, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের একটি সংস্থার হাতে নীতি পরিবর্তনের ক্ষমতা অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত। তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত কর অব্যাহতির কারণে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে সীমিত সংখ্যক করদাতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, রাজস্ব ঘাটতি ও বিনিয়োগ সংকট একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব নয়। তিনি শুধু বিদেশি নয়, দেশীয় বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
এফআইসিসিআই সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, দেশে করহার তুলনামূলক বেশি হলেও করজালের পরিধি এখনও সীমিত। ফলে নিয়মিত কর প্রদানকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি কর কাঠামোয় বৈষম্য কমিয়ে সংস্কারের আহ্বান জানান।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিবছর উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা অর্জিত হচ্ছে না। এটি নীতিগত ও কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন। তিনি ব্যয়নির্ভর বাজেট প্রণয়নের পরিবর্তে সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।
তার মতে, একবার কর অব্যাহতি দেওয়া হলে তা দীর্ঘ সময় বহাল থাকে। এতে রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি বাজারে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। এ কারণে তিনি নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক প্রণোদনা ব্যবস্থার সুপারিশ করেন।
বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নীতির মধ্যে সমন্বয় না থাকায় ব্যবসা পরিচালনা আরও জটিল হয়ে উঠছে। ট্রেড লাইসেন্সসহ পুরোনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কম হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তনের কারণে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ভ্যাট ও কর কাঠামোয় নিয়মিত পরিবর্তন ব্যবসায়ীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি দীর্ঘমেয়াদি নীতি স্থিতিশীলতা এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা ব্যবস্থার ওপর জোর দেন।

