দেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি আরও কমে এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন নেমে এসেছে সাম্প্রতিক পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এই ধীরগতি একদিকে সরকারের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ প্রবাহেও তৈরি করছে চাপ।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) গতকাল জুলাই-মার্চ সময়ের এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, এ সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৩৯ দশমিক ১৯ শতাংশ। আরও আগের তিন অর্থবছরে একই সময়ে বাস্তবায়ন ছিল ৪১ থেকে ৪৫ শতাংশের বেশি।
খরচের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই চিত্র। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় ছিল ৮২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যয় কমেছে ৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা।
শুধু নয় মাসের হিসাবেই নয়, একক মাস মার্চেও উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কমেছে। মার্চে ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ২৭৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আগের বছরের মার্চে ব্যয় ছিল ১৫ হাজার ৩৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যা তখনকার এডিপির ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এডিপি বড় আকারে কাটছাঁট করা হয়েছে। মূল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে সংশোধিত এডিপি ধরা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে রাখা হয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় কাটছাঁট হয়েছে সামাজিক খাতে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে কমেছে ৫৫ শতাংশ। প্রথম ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে—১৮ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। এরপর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ৮ হাজার ৯২০ কোটি, বিদ্যুৎ বিভাগে ৭ হাজার ৭৬৩ কোটি এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ৬ হাজার ২৬২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ব্যয় করেছে মাত্র ২৬৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ৬৭৮ কোটি টাকা।
এডিপি বাস্তবায়নের এই ধারাবাহিক নিম্নগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নীতিনির্ধারক ও গবেষকেরা। তাদের মতে, এ প্রবণতা উন্নয়ন পরিকল্পনার দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির গতি প্রভাবিত করতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংশোধিত এডিপির বাস্তবায়ন দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরের ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সব মিলিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের এই ধীরগতি অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলছে।
সিভি/এম

