বাংলাদেশ এখনো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ।
সম্প্রতি প্রকাশিত সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট বিনিয়োগ প্রবাহের হিসাবে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গড়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকলেও জনসংখ্যা, অর্থনীতির আকার এবং স্থায়ী মূলধন বিনিয়োগের তুলনায় পিছিয়ে আছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এসব সূচকে বাংলাদেশ শুধু কিছু একক দেশের নয়, বরং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গড় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বভুক্ত দেশগুলোর তুলনায়ও পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ এই দুই জোটে যোগ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। বর্তমানে দেশে স্থায়ী মূলধন বিনিয়োগের মাত্র ১ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের ০.৪ শতাংশ আসে বিদেশি বিনিয়োগ থেকে।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরে গড়ে ১.৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা কম্বোডিয়ার অর্ধেকেরও কম। একই সময়ে ভিয়েতনামে বছরে গড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। ইন্দোনেশিয়াও বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। বিদেশি বিনিয়োগের মোট সঞ্চয় বা স্টকের দিক থেকেও বাংলাদেশ কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং আঞ্চলিক জোটগুলোর পেছনে রয়েছে। তবে ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গড়ের চেয়ে কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।
ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় বছরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ কমেছে। যদিও ২০২৫ সালের শুরুতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৯ সালে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এরপর থেকে ধীরে ধীরে কমে এটি আগের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পায় এবং কোভিড-পরবর্তী সময়ের স্তরের নিচেও নেমে আসে। তবে বিদেশি বিনিয়োগের মোট সঞ্চয় প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল রয়েছে। এর মানে হলো, পুরোনো বিনিয়োগকারীরা থাকলেও নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং কার্যক্রমগত সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। ২০২১ সাল থেকে টাকার মান ডলারের বিপরীতে প্রায় ৩৬ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে লাভ দেশে ফেরত নেওয়া এবং আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা, উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে এবং শিল্প কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮ শতাংশ থেকে কমে ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে শ্রম অস্থিরতাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের শুরুতে বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও তা মূলত পুরোনো বিনিয়োগকারীদের পুনঃবিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে এসেছে। নতুন বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম।
ইউএনসিটিএডি বলেছে, একটি জাতীয় বিনিয়োগ নীতি এবং সমন্বিত বিনিয়োগ আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে। সংস্থাটি আরও বলেছে, বিনিয়োগ প্রচার ও সহজীকরণ ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে এবং যেসব খাতকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার প্রভাব মোকাবিলায় আগেভাগে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ইউএনসিটিএডির কর্মকর্তা কিয়োশি আদাচি বলেন, আগের সুপারিশগুলোর অনেকগুলোই এখনো আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৮০ সালের পুরোনো বিনিয়োগ আইন এখনো কার্যকর, যেখানে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও বিদেশি বিনিয়োগ সংক্রান্ত স্পষ্ট কাঠামো নেই।
বিনিয়োগ অনুমোদনে একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয় এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার অগ্রগতি হলেও অনেক ক্ষেত্রে এখনো হাতে করা প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরতা রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন জটিলতা, জমি প্রাপ্তির সমস্যা, অবকাঠামো ঘাটতি এবং দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল করছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বলেন, সুসংহত নীতি এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন র্যাংস মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানা রউফ চৌধুরী, পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ, বিডার সাবেক মহাপরিচালক আরিফুল হক, বাণিজ্য নীতি ও সহজীকরণ বিশেষজ্ঞ মো. হাফিজুর রহমান এবং বিডার নির্বাহী সদস্য হুমায়ুন কবির।

