বাংলাদেশের কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সংকটের মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন করছেন। তাদের আয় সীমিত, অথচ উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময়ই চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় তাদের।
উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়েও কৃষকদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাজার ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে অনেক সময় কৃষকরা ভোক্তা মূল্যের অর্ধেক দামও পান না। এতে উৎপাদনকারী হিসেবে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হন।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও কৃষকদের অবস্থান দুর্বল। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে একদিকে তারা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন, অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে ঋণের বোঝা বাড়ে। অনেক কৃষক মাঠে কাজ করতে গিয়ে সাপের কামড়, বজ্রপাত বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান। কিন্তু এসব ঘটনার পর তাদের পরিবার কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পায় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন তারা কাজ করার সক্ষমতা হারান, তখন জীবিকা নির্বাহ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। আর্থিক সংকটে অনেক কৃষককে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়।
এই বাস্তবতায় কিছু উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানিয়েছে বিএনপি সরকার। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারা ঋণগ্রস্ত কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানি সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষকদের সুরক্ষায় চালু করা হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’। এটি মূলত কৃষকের পরিচয় শনাক্তকরণ কার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং অনেকের কাছে এটি মর্যাদা ও সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই কার্ডের মাধ্যমে একজন কৃষক ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে—
১. ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি
২. সেচ সুবিধা
৩. সহজ শর্তে কৃষি ঋণ
৪. স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি পাওয়া
৫. সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা
৬. মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য
৭. কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ
৮. ফসলের রোগবালাই দমনের পরামর্শ
৯. কৃষি বীমা সুবিধা
১০. ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ
এই ব্যবস্থার আওতায় শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকই নন, মৎস্য চাষী বা আহরণকারী এবং প্রাণিসম্পদ খাতে যুক্ত খামারি ও চাষীরাও সরকারের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। এতে ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়—সব শ্রেণির কৃষক অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের ক্ষেত্রে এই কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড হিসেবেও ব্যবহৃত হবে। সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় কৃষকদের নামে পৃথক হিসাব খোলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আগের এক সরকারের আমলে কৃষি উপকরণ কার্ড বিতরণ করা হলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অনেক কৃষকই সেই কার্ড ব্যবহার না করে পলিথিনে মুড়িয়ে ঘরে ট্রাংক বা আলমারিতে রেখে দেন। বাস্তবে তখন সরকারি নগদ সহায়তা নিতে জাতীয় পরিচয়পত্রই বেশি ব্যবহৃত হতো। ডিলারদের মাধ্যমে সার ও বীজ সংগ্রহও চলত স্বাভাবিক নিয়মে, আলাদা কার্ড ব্যবস্থার তেমন প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়নি।
তবে নতুন পরিস্থিতিতে ‘কৃষক কার্ড’ আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। এবার পরিকল্পনায় রয়েছে ভর্তুকিযুক্ত কৃষি উপকরণ ও নগদ সহায়তা প্রদান এই কার্ডের মাধ্যমে আরও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে করা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই কার্ড ব্যবহার করার সুযোগ রাখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে কৃষি ঋণ প্রাপ্তি অনেকটাই জামানতের ওপর নির্ভরশীল। ভূমিহীন ও বর্গাচাষীদের জন্য সেই জামানত জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কৃষক কার্ডকে জামানতের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য বৃদ্ধ বয়সে পেনশন সুবিধা এবং সরকারি অনুদান সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবেও এই কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।
এদিকে সরকার ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ও চালু করেছে। এই দুই ধরনের কার্ড নিয়ে কিছুটা দ্বৈততা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। ফ্যামিলি কার্ড মূলত টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য বিতরণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষক কার্ডের উদ্দেশ্য কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, প্রণোদনা ও কৃষি ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা। একই ব্যক্তি দুটি কার্ডের সুবিধা পেতে পারেন—এমন ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, গ্রামীণ কৃষি পরিবারগুলোর জন্য কৃষক কার্ড এবং শহরসহ অন্যান্য অকৃষি পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড নির্দিষ্ট করা হলে ব্যবস্থাপনায় জটিলতা কমতে পারে। এতে কৃষি সহায়তা আরও সুনির্দিষ্টভাবে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
অন্যদিকে বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় উদ্যোগ হিসেবে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফের ঘোষণা দেয়। এর আগে ১৯৯১–৯৬ মেয়াদে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের সুদ-আসল মওকুফ করা হয়েছিল। এবার নির্বাচনী ইশতাহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তে প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হয়েছেন। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ১ হাজার ৫৬৮ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে। ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে নেওয়া ঋণ এই সুবিধার আওতায় এসেছে। এর লক্ষ্য হিসেবে দরিদ্র কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং কৃষি খাতকে শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে। এতে ঋণের চাপ কমে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে বলেও আশা করা হচ্ছে।
তবে কৃষি ঋণ মওকুফ নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, অতীতে বারবার ঋণ মওকুফের ফলে ঋণ না ফেরানোর সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা খেলাপি ঋণ বাড়াতে পারে। তাদের মতে, মূল গুরুত্ব হওয়া উচিত সঠিকভাবে ঋণ ব্যবহার, কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের পরিশোধ সক্ষমতা বাড়ানো। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ কৃষিতে দেওয়া হয়। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের আওতায় আসতে পেরেছেন মাত্র ২২ শতাংশ কৃষি পরিবার। এই পরিসর বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, যাতে কৃষি খাতে অর্থায়ন আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হয়।
নতুন সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে খাল ও নদী খনন এবং পুনঃখননের কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল ও নালা খনন বা পুনঃখনন করা। এর মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগে শুষ্ক মৌসুমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ সম্প্রসারণ এবং বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে তা কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এই কর্মসূচি স্থানীয় কৃষিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট সেচ এলাকা প্রায় ৯৭ দশমিক ৯০ লাখ হেক্টর। মোট আবাদি জমির প্রায় ৭৪ শতাংশ এখন সেচের আওতায় রয়েছে। এর বড় অংশই ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর। মোট সেচ ব্যবস্থার প্রায় ৭১ দশমিক ৭৩ শতাংশে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ১৮ দশমিক ১৩ শতাংশ গভীর নলকূপ এবং ৫৩ দশমিক ৩০ শতাংশ অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া হয় মাত্র ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ জমিতে। এর মধ্যে এলএলপি ব্যবহারের মাধ্যমে ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ জমিতে সেচ হয় এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া হয় ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ জমিতে।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক এলাকায় পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নলকূপ দিয়ে পর্যাপ্ত পানি উত্তোলনও সম্ভব হচ্ছে না। এতে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। কিন্তু এর জন্য নদী ও খালগুলোকে কার্যকর রাখা জরুরি। বাস্তবতায় দেখা যায়, দেশের অনেক নদীই এখন নাব্যতা হারিয়েছে। অনেক স্থানে চর জেগে উঠেছে। খালগুলো ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও খাল দখল করে বসতি ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর ফলে সেচ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মক চাপে পড়েছে। অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই সমস্যার সমাধানে অতীতেও বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ব্যাপক খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি শুরু হয়। সেই সময় প্রায় পৌনে ৬ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন সম্পন্ন হয়েছিল বলে জানা যায়। এর ইতিবাচক প্রভাব কৃষি উৎপাদনে পড়েছিল। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘোষণা করা হয় এবং ওই বছর ১০ হাজার টন চাল রফতানির কথাও উল্লেখ করা হয়।
সেই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ছিল যশোরের শার্শা উপজেলার উলশি যদুনাথপুর খাল খনন। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর সেখানে স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এটি ছিল দেশের প্রথম সংগঠিত স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক খাল খনন প্রকল্পগুলোর একটি। পরে ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদ পুনঃখননের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে ১৯৮২ সালের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক খাল খনন কর্মসূচি ধীরে ধীরে গতি হারায়। পরবর্তীতে স্বনির্ভর কর্মসূচিও আর আগের অবস্থায় টিকে থাকেনি।
বর্তমান প্রস্তাবিত কর্মসূচি সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, খাল–নদী পুনরুদ্ধার ছাড়া টেকসই কৃষি উন্নয়ন এবং পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে খাল ও নদী খনন এবং পুনঃখননের যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানে স্বেচ্ছাশ্রমের উপাদান যুক্ত থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। এতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এই কর্মসূচির বৃহৎ পরিসরের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ওপর। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষের আয়ের সুযোগ বাড়বে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাজের টেকসই মান বজায় না থাকলে স্বল্প সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সুফল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
খাল ও নদী খননের ক্ষেত্রে আরও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। শীতকালে যেসব খাল খনন করা হয়, সেগুলো বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই যাতে পাড় ভেঙে বা ভরাট হয়ে না যায়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে দখল হয়ে যাওয়া নদী ও খাল পুনরুদ্ধার করাও জরুরি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে দরিদ্র মানুষদের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নদী ও খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি মৎস্য চাষ এবং হাঁস পালনকে উৎসাহিত করে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে। এতে খাল-বিল ও নদী-নালাগুলো অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এদিকে দেশের কৃষি খাত বর্তমানে এক ধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যশস্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আউশ ও আমন ধান উৎপাদনে আগাম পরিকল্পনা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রবিশস্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ আগেভাগেই নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি খাতে ভর্তুকি ও বিনিয়োগ বাড়ানো, কৃষকদের জন্য সমন্বিত সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার অবসান ঘটানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কৃষিকে শুধু জীবিকার খাত নয়, বরং লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সব মিলিয়ে কৃষি খাতকে ঘিরে নেওয়া এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নই ভবিষ্যতে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন সরকারের সব কৃষিবান্ধব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিভি/এম

