রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চাপের মধ্যেই দেশের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটকে কেবল একটি আর্থিক দলিল হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটিকে সংকট কাটিয়ে ওঠার একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে বাজেট ঘোষণার পর থেকেই অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং নীতিনির্ধারকদের বড় একটি অংশের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাঁদের মতে, ঘোষিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। দীর্ঘ ১৯ বছর পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের উপস্থাপিত এই প্রথম বাজেটকে অনেকে ‘স্বপ্নের বাজেট’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকারকে এমন একাধিক অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, যা বর্তমান বাস্তবতায় অনেকের কাছেই প্রায় দুরূহ বলে মনে হচ্ছে।
ঘাটতির পাহাড় ডিঙিয়ে নতুন রাজস্ব লক্ষ্য:
দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চাপ এখন রাজস্ব আহরণে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ এ সময়ের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। ফলে ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আয়ের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল এনবিআরের ওপরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক রাজস্ব ঘাটতির বাস্তবতায় এ ধরনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের ধারণা, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে অর্থনীতির সামগ্রিক গতি ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি এবং বিনিয়োগে দৃশ্যমান উন্নতি না হলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
ব্যয়ের পাহাড়ে অর্থের উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা:
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে রেকর্ড ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এডিপির বাইরে আরও ১৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয়ও রয়েছে। এই বিশাল ব্যয়ের অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে—এমন প্রশ্ন এখন অর্থনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছালে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে। এতে ব্যাংক খাতে তারল্যের ওপর চাপ বাড়বে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সংকুচিত হতে পারে এবং সামগ্রিক বিনিয়োগে স্থবিরতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেটের রাজস্ব ও প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন অত্যন্ত আশাবাদী। তাঁর ভাষায়, “চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রপ্তানি, রাজস্ব আদায় ও বেসরকারি ঋণে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে—এমন অনুমানের ওপরই আগামী বাজেট দাঁড়িয়ে আছে।”
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কি বাস্তবসম্মত?
আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির অবস্থায় রয়েছে। উচ্চ সুদের হার, উদ্যোক্তাদের আস্থার সংকট, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাজারে দুর্বল চাহিদা—সব মিলিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, এই পরিস্থিতিতে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে বড় ধরনের গতি আনা ছাড়া বিকল্প নেই, যা বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন একটি লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে লড়াই:
আগামী অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অথচ বর্তমানে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। এর জন্য খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন, আমদানি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত। তাই উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) প্রস্তাবিত বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটি সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ ও হয়রানির কারণ হতে পারে।
এমসিসিআইয়ের মতে, বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর এখন আর বিকল্প নয়, বরং এটি একটি বাধ্যবাধকতা।
তিনি জানান, বিনিয়োগে প্রশাসনিক জটিলতা ও নিয়ন্ত্রণ কমাতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। পাশাপাশি সরকারি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা, বিলম্ব বা হয়রানির বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন—এমন একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, নির্ধারিত সময়ে কোনো সেবা না মিললে তার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নেও ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ চালুর কথা তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, অতীতে যেখানে এক বছরের প্রকল্প শেষ হতে সাত থেকে দশ বছর লেগেছে, নতুন ব্যবস্থায় তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
সাফল্যের চাবিকাঠি: সুশাসন ও বাস্তবায়ন
অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ মনে করেন, বাজেটে যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তার অনেকগুলো কাগজে-কলমে উচ্চাভিলাষী মনে হলেও সেগুলো একেবারেই অর্জনযোগ্য নয়—এমন নয়। তবে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন হবে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। তাঁদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমানো, সরকারি ব্যয়ের অপচয় রোধ, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম দমন করা গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাস্তবতা না স্বপ্ন—কোন পথে এই বাজেট?
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে রয়েছে রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ সংকট ও ঋণের চাপ। অন্যদিকে রয়েছে অর্থনীতিকে পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা।
এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে বাজেটটি। তাই অনেক অর্থনীতিবিদ একে দেখছেন ‘অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা’ হিসেবে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সরকার কি কেবল বড় স্বপ্ন দেখছে, নাকি প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে?
এর উত্তর মিলবে আগামী এক বছরে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে কেবল বাজেট বক্তৃতায় নয়, বরং মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই।
সব মিলিয়ে বাজেট এখন আর শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এক ধরনের পরীক্ষার নাম। লক্ষ্যগুলো উচ্চাভিলাষী, বাস্তবতা কঠিন, আর পথচলা অনিশ্চয়তায় ভরা। তবুও অর্থনীতির এই সংকটময় সময়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—নীতি ও বাস্তবতার ব্যবধান কতটা কমানো যায়।
প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে সামনে—এই বাজেট কি সত্যিই অর্থনীতিকে নতুন পথে নিতে পারবে, নাকি চাপ আর প্রতিশ্রুতির ভারে বাস্তবায়নের আগেই থমকে যাবে? উত্তর লুকিয়ে আছে পরের দিনের অর্থনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে কাগজের পরিকল্পনা নয়, মাঠের ফলাফলই শেষ কথা বলবে।

