আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায়, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ কিছুটা কমানো হতে পারে। তবে এতে বাজেট ঘাটতি পূরণে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। একই সময়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়তে থাকবে।
অর্থবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সরকারের ব্যয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে এ ব্যয় দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা এখনো কম কর আদায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। একই ধরনের অর্থনীতির অনেক দেশে এই হার দ্বিগুণেরও বেশি।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১২ থেকে ১৯ শতাংশের মধ্যে। শ্রীলঙ্কাতেও এ হার প্রায় ১২ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই এই হার ৭ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে বাজেট ঘাটতি বাড়ছে এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এ পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর কঠোর গুরুত্ব দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বৈশ্বিক উত্তেজনা অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি, জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বড় বড় বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাবে। তখন নতুন করে একাধিক প্রকল্পের ঋণ কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। এর ফলে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার হবে আসল ঋণ এবং প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সুদ। আর ২০২৫-২৬ থেকে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছর পর্যন্ত সময়কালে এই দায় বেড়ে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকারকে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ধীরগতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরও বড় চাপ তৈরি করবে। তার ভাষায়, সরকার যদি বাজেট ঘাটতি পূরণে আরও বেশি বৈদেশিক ঋণ নেয়, তাহলে ঋণ পরিশোধের বোঝা বাড়তেই থাকবে। আবার দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই রাজস্ব আদায় বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে আগামী বছর বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও কঠিন সময়ের মুখে পড়তে পারে। সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্য মজুত শক্তিশালী করা এবং অর্থনীতির ভিত মজবুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় আকারের ঋণ গ্রহণ, অনুদান কমে যাওয়া এবং গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার কারণে আগামী পাঁচ বছরেই ২৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের চাপ তৈরি হচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতির সময়ে এই বাড়তি দায় সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। তাদের মতে, এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি না নিলে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। উৎপাদন, রপ্তানি ও রাজস্ব কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে না পারলে বৈদেশিক ঋণের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত সরকারের নেওয়া একাধিক উচ্চ ব্যয়ের মেগা প্রকল্প বর্তমান বৈদেশিক ঋণচাপের বড় কারণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেখানে প্রায় ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং যমুনা রেলওয়ে সেতু প্রকল্পেও বিপুল ব্যয় হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের অভিযোগ, এসব প্রকল্পের ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে অতিমূল্যায়িত ছিল। পাশাপাশি দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, অর্থ পাচার এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস তৈরি করতে না পারাও দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

