মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা এবং নতুন কর্মী পাঠানোর গতি কমে যাওয়ার পরও বাংলাদেশের প্রবাসী আয় এখন অর্থনীতির জন্য বড় আশার জায়গা হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশে টানা পাঁচ মাস ধরে প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি এসেছে। এমন সময়ে এই ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয় এবং রিজার্ভ নিয়ে অর্থনীতিতে উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩.১৩ বিলিয়ন ডলার। এর আগের মাস মার্চে আসে ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলার, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে রেকর্ড পর্যায়ের প্রবাহ। মার্চে ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে আসে ৩.০২ বিলিয়ন ডলার, জানুয়ারিতে ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার এবং ডিসেম্বরে ৩.২২ বিলিয়ন ডলার। ফলে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে।
এই প্রবাহ শুধু মাসভিত্তিক হিসাবেই নয়, অর্থবছরভিত্তিক হিসাবেও ইতিবাচক ছবি দেখাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ২৯.৩২ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২৪.৫৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯.৫৪ শতাংশ। শ্রমবাজারে ধীরগতি থাকা সত্ত্বেও এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের ভেতরে কিছু সতর্কতার বিষয়ও আছে। নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার হার কমে গেলে দীর্ঘ মেয়াদে প্রবাসী আয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ প্রবাসী আয়ের বড় অংশ আসে কর্মরত শ্রমিকদের নিয়মিত পাঠানো অর্থ থেকে। তাই বর্তমানে আয় বাড়লেও ভবিষ্যৎ প্রবাহ ধরে রাখতে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি, পুরোনো বাজারে স্থিতিশীলতা এবং কর্মী পাঠানোর জটিলতা কমানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রতি আস্থা কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আসায় বৈধ পথে ডলার আসছে বেশি। আগে অনেক প্রবাসী দ্রুততা, সুবিধা বা বিনিময় হারের কারণে অবৈধ পথে টাকা পাঠাতেন। এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নজরদারি, প্রণোদনা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক পথে ফিরছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বৈদেশিক বাণিজ্যে চালানে কম বা বেশি মূল্য দেখানোর অপব্যবহার কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ধরনের অনিয়ম কমলে ডলার ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার সুযোগ কমে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় থেকে যায়। এটি প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ—দুই ক্ষেত্রেই সহায়ক হতে পারে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. তাসনীম সিদ্দিকী মনে করেন, প্রবাসী আয় এখন দেশের অর্থনীতির একটি স্থিতিশীল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। তবে তাঁর মতে, শুধু বর্তমান প্রবাহ দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। নতুন কর্মী পাঠানোর পথে যে প্রশাসনিক, কূটনৈতিক ও বাজারসংক্রান্ত বাধা তৈরি হয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে। তিনি মনে করেন, মাসিক প্রবাসী আয় সাড়ে তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলারের মধ্যে স্থিতিশীল রাখতে পারলে অর্থনীতির জন্য তা আরও স্বস্তিদায়ক হবে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলামও মনে করেন, এই ধারা ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত নজরদারি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কারণ প্রবাসী আয় হঠাৎ বাড়া যেমন ভালো খবর, তেমনি হঠাৎ কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শুধু প্রবাহ বাড়ানো নয়, প্রবাহকে নিয়মিত ও পূর্বানুমেয় করাও গুরুত্বপূর্ণ।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষক ও অর্থনীতিবিদ হেলাল আহমেদ জনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার মধ্যেও প্রবাসী আয় বাড়া বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক সংকেত। তবে সংকট দীর্ঘ হলে তার প্রভাব এড়ানো কঠিন হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের বহু প্রবাসী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজ করেন। সেখানে শ্রমবাজার সংকুচিত হলে বা কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ে চাপ পড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব বহুদিনের। এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নয়, দেশের লাখো পরিবারের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। গ্রামীণ অর্থনীতি, ভোগব্যয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রবাসী আয়ের বড় প্রভাব রয়েছে। তাই এই প্রবাহ বাড়া মানে শুধু ব্যাংকে ডলার আসা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত আছে পরিবার, বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি।
তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। প্রথমত, বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দিতে হবে, যাতে তারা বেশি আয় করতে পারেন। তৃতীয়ত, প্রবাসীদের জন্য বৈধ পথে টাকা পাঠানো আরও সহজ, দ্রুত ও লাভজনক করতে হবে। চতুর্থত, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে। পঞ্চমত, নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
সব মিলিয়ে এপ্রিলের ৩.১৩ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর। তার চেয়েও বড় বিষয় হলো, টানা পাঁচ মাস ধরে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় আসা একটি স্থিতিশীল প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই অর্জন ধরে রাখতে হলে শুধু বর্তমান প্রবাহের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা, শ্রমবাজারের সম্প্রসারণ, প্রবাসী সুরক্ষা এবং বৈধ আর্থিক চ্যানেলকে আরও শক্তিশালী করা। তাহলেই প্রবাসী আয় সাময়িক স্বস্তি নয়, বরং অর্থনীতির টেকসই শক্তি হিসেবে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

