দেশের অর্থনীতির জন্য আমদানি ও রফতানি—দুই খাতই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রফতানি থেকে আসে বৈদেশিক মুদ্রা, আর আমদানি নির্ভর করে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর। তাই এই দুই খাতে একসঙ্গে ধীরগতি দেখা দিলে সেটি শুধু বাণিজ্যের হিসাব নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হয়ে দাঁড়ায়।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, দেশের পণ্য রফতানি কমেছে ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে রফতানির সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাকেও পতন দেখা গেছে। তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ। একই সঙ্গে রফতানির শীর্ষ খাতগুলোর একটি কৃষিজ পণ্যের রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
রফতানির এই মন্দাভাবের পাশাপাশি আমদানিতেও চাপ স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ভোগ্যপণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলা কমেছে দশমিক ১৯ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা কমেছে ৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। শিল্পের কাঁচামালের ঋণপত্র কমেছে ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং রফতানি-সংযুক্ত ঋণপত্র খোলা কমেছে ১০ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
এই সংখ্যাগুলো আলাদা করে দেখলে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে দেখলে এগুলো একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে। ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমা মানে বাজারে চাহিদা দুর্বল হতে পারে। শিল্প কাঁচামালের আমদানি কমা মানে উৎপাদনে ধীরগতি আসতে পারে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমা আরও বড় সংকেত দেয়, কারণ এটি নতুন বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ শিল্প সম্প্রসারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
অন্যদিকে রফতানি-সংযুক্ত ঋণপত্র কমে যাওয়া রফতানিমুখী শিল্পের জন্য সতর্কবার্তা। সাধারণভাবে রফতানি আদেশ বাড়লে কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজনও বাড়ে। কিন্তু সেই ঋণপত্র কমে গেলে বোঝা যায়, সামনে উৎপাদন বা রফতানি আদেশে চাপ থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, রফতানি কমে যাওয়া শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের দুর্বল চাহিদা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ডলারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত সরাসরি প্রভাবিত হয়। কারণ দেশের রফতানির বড় অংশই এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, আমদানি ও রফতানির একসঙ্গে নিম্নমুখী প্রবণতা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। আমদানি কমে গেলে স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিছুটা কম মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। তিনি রফতানি বাজার বহুমুখীকরণ, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন।
শিল্পোদ্যোক্তাদের দৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও বাস্তব। কয়েক বছর ধরেই শিল্প খাত নানা ধরনের চাপে রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। উচ্চ সুদের হার, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগে সতর্ক হয়ে পড়েছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমে যাওয়ায় স্টিল ও সিমেন্টের মতো নির্মাণসামগ্রীর চাহিদাও কমেছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ মনে করেন, এখন বড় প্রবৃদ্ধির পেছনে না ছুটে বিদ্যমান শিল্প ও সেবা খাতকে টিকিয়ে রাখার পরিবেশ তৈরি করাই বেশি জরুরি। অর্থাৎ এই মুহূর্তে লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা।
তবে পুরো চিত্রই নেতিবাচক নয়। এপ্রিলে রফতানি খাতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এটি ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাষ্যে, টানা আট মাসের নেতিবাচক ধারা কাটিয়ে এপ্রিলে রফতানিতে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন দেখা গেছে।
মাসভিত্তিক হিসাবেও উন্নতি চোখে পড়ার মতো। মার্চে রফতানি ছিল ৩৪৮ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার ডলার। সে তুলনায় এপ্রিলে রফতানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো মনে করছে, বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের চাহিদা কিছুটা ফিরে আসা এবং দেশের রফতানি শিল্পের সক্ষমতা এই উন্নতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
তবে বড় ছবিতে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট পণ্য রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ৯৩৯ কোটি ৬৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি ছিল ৪ হাজার ২০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। ফলে সামগ্রিকভাবে এখনো রফতানি ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ কম।
তৈরি পোশাক খাত এখনো দেশের রফতানির প্রধান ভরসা। জুলাই থেকে এপ্রিল সময়ে এ খাতে রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ১৭১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। তবে ১০ মাসের হিসাবে এই খাতের রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ। শুধু এপ্রিলে তৈরি পোশাক রফতানিতে ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধিকে স্থায়ী উন্নতির প্রমাণ হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকা দরকার বলে মনে করছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, এপ্রিলে রফতানি বৃদ্ধির বড় কারণ হলো মার্চে কম রফতানি হওয়া। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মার্চে কারখানাগুলোতে প্রায় ১০ দিনের দীর্ঘ ছুটি ছিল। এতে উৎপাদন ও পণ্য পাঠানো ব্যাহত হয়। সেই পণ্যগুলোর একটি অংশ এপ্রিলে পাঠানো হয়েছে বলে এপ্রিলে প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা গেছে।
তার মতে, কোনো কারখানায় হঠাৎ অতিরিক্ত আদেশ আসেনি বা নতুন ক্রেতার চাপও অস্বাভাবিকভাবে বাড়েনি। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে আবার বড় ছুটি থাকায় রফতানিতে আবার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। প্রকৃত অবস্থা বুঝতে জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও রফতানি পরিস্থিতিকে কয়েকটি বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। তার মতে, আগস্টের পর থেকে রফতানি কমার অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক। পাশাপাশি দেশের নির্বাচন, নির্বাচন হবে কি না—এ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নির্বাচন-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বেগও জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রফতানিতে প্রভাব ফেলেছে।
আমদানির সঙ্গে রফতানির সম্পর্কও তিনি তুলে ধরেছেন। রফতানি আদেশ কমলে কাঁচামাল আমদানিও স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামের ওঠানামাও আমদানি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির আগে তৈরি পোশাকের কাঁচামালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের সতর্ক করেছে।
এপ্রিলের তৈরি পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি নিয়ে মাহমুদ হাসান খান আরও মনে করেন, ক্রেতাদের আস্থা কিছুটা ফিরে আসা এবং সরকারের নীতিসহায়তাও ভূমিকা রেখেছে। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ঈদের ছুটি অন্তত ছয়দিন ছিল। সেই তুলনাগত প্রভাবও এবার প্রবৃদ্ধিকে বড় দেখাতে পারে। তাই এক মাসের বড় প্রবৃদ্ধি দেখে পুরো খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে বৈশ্বিক অস্থিরতাও বড় কারণ। বর্তমানে পৃথিবীতে দুটি বড় যুদ্ধ চলছে। গত দুই মাসে এমন একটি অঞ্চলে সংঘাত চলছে, যার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল যে প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়, সেটিও স্থবিরতার মুখে রয়েছে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাব বিশ্ব বাণিজ্য ও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট—সাম্প্রতিক তথ্য দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। যুদ্ধ পরিস্থিতি থেমে গেলে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরলে পরিস্থিতি আবার পরিবর্তিত হতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান মন্দা আংশিকভাবে বৈশ্বিক চাপের ফল, তবে দেশীয় নীতি ও ব্যবসা পরিবেশও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
সব মিলিয়ে দেশের আমদানি-রফতানি পরিস্থিতি এখন এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে। একদিকে ১০ মাসের হিসাবে রফতানি কমেছে, আমদানির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোও দুর্বল। অন্যদিকে এপ্রিলে রফতানির বড় উত্থান কিছুটা আশার বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু এই উত্থান কতটা স্থায়ী, তা এখনই বলা কঠিন।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাময়িক প্রবৃদ্ধির আনন্দে না ভেসে দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা চিহ্নিত করা। তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে রফতানি পণ্য ও বাজার বাড়াতে হবে। শিল্পের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। জ্বালানি, ঋণ, বন্দর, পরিবহন ও নীতিগত স্থিতিশীলতায় উন্নতি আনতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখাও জরুরি।
এপ্রিলের রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা। তবে আমদানি ও রফতানির সামগ্রিক নিম্নমুখী প্রবণতা দেখিয়ে দিচ্ছে, দেশের বাণিজ্য খাত এখনো চাপমুক্ত নয়। আগামী কয়েক মাসে রফতানি আদেশ, আমদানি ঋণপত্র, উৎপাদন প্রবণতা এবং বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা—এই চারটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের বাণিজ্য পরিস্থিতি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, নাকি সাময়িক উল্লম্ফনের পর আবার ধীরগতিতে ফিরছে।

