দীর্ঘ আট মাসের টানা দুর্বলতা কাটিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের ২০২৫-২৬ সালের এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ মার্কিন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই মাসে এই আয় ছিল ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩২.৯২ শতাংশ।
এই উত্থান নিঃসন্দেহে রপ্তানি খাতের জন্য স্বস্তির খবর। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ক্রেতাদের সতর্ক অবস্থান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ছুটিজনিত ব্যাঘাতের মধ্যেও এমন প্রবৃদ্ধি নতুন আশার ইঙ্গিত দেয়। তবে এই সাফল্যকে কতটা স্থায়ী ধারা হিসেবে দেখা যাবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে এখনো সতর্কতা রয়েছে।
মার্চ মাসের তুলনায়ও এপ্রিলের রপ্তানি আয় বেশ ভালো অবস্থানে গেছে। মার্চে রপ্তানি হয়েছিল ৩৪৮ কোটি মার্কিন ডলার। সেখান থেকে এপ্রিল মাসে আয় বেড়ে ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। মাসভিত্তিক হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫.২০ শতাংশ। এই হিসাব বলছে, বছরের শেষ প্রান্তিকে রপ্তানি খাতে কিছুটা গতি ফিরেছে।
তবে পুরো অর্থবছরের চিত্র এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩৯ কোটি ৬৪ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ৪ হাজার ২০ কোটি ৮১ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ সামগ্রিক হিসাবে এখনো রপ্তানি আয় ২.০২ শতাংশ কম। ফলে এপ্রিলের বড় প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পুরো অর্থবছরের ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভরকেন্দ্র এখনো তৈরি পোশাক খাত। এই খাতই এপ্রিলের উত্থানের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। জুলাই থেকে এপ্রিল সময়কালে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ১৭১ কোটি ৯৩ লাখ মার্কিন ডলার। বছরওয়ারি হিসাবে এই খাতে ৩১.২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে।
শুধু এপ্রিল মাসের হিসাব দেখলেও পোশাক খাতের অবস্থান শক্তিশালী। এপ্রিল ২০২৬ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩১৪ কোটি মার্কিন ডলারে। আগের বছরের এপ্রিল মাসে এই আয় ছিল ২৩৯ কোটি ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের উত্থান হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। আগের অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতের মোট আয় ছিল ৩ হাজার ২৬৪ কোটি মার্কিন ডলার। সেই তুলনায় চলতি সময়ের আয় এখনো কিছুটা কম। তাই মাসিক প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও পুরো বছরের ফলাফল বোঝার জন্য আরও কয়েক মাসের তথ্য দেখা প্রয়োজন।
রপ্তানির বাজারভিত্তিক চিত্রেও ইতিবাচক বার্তা আছে। বাংলাদেশের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। যুক্তরাজ্যেও রপ্তানি বেড়েছে ২৩.৪৬ শতাংশ। এই দুই বড় বাজারে প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় অংশই এসব বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতেও উন্নতির ধারা বজায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এই খাতে রপ্তানি হয়েছে ৯৮ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.৯৫ শতাংশ। শুধু এপ্রিল মাসে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১১ কোটি মার্কিন ডলার। মাসটিতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩৫.৬৭ শতাংশ।
অন্যদিকে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের চিত্র কিছুটা মিশ্র। জুলাই থেকে এপ্রিল সময়ে এই খাতের রপ্তানি হয়েছে ৮২ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৪.৬৯ শতাংশ কম। তবে এপ্রিল মাসে এই খাতেও হঠাৎ ইতিবাচক ধারা দেখা গেছে। এপ্রিল মাসে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৮ কোটি ৫৯ লাখ মার্কিন ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬৫ শতাংশ।
তবে এপ্রিলের বড় প্রবৃদ্ধিকে সরাসরি নতুন চাহিদার ফল হিসেবে দেখছেন না অনেকে। নিট পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, এপ্রিল মাসের তৈরি পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হলো মার্চ মাসে কম রপ্তানি হওয়া। তাঁর মতে, মার্চ মাসে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কারখানাগুলো প্রায় ১০ দিনের দীর্ঘ ছুটিতে ছিল। এ কারণে উৎপাদন কমে যায় এবং অনেক রপ্তানি চালান সময়মতো পাঠানো সম্ভব হয়নি।
ফলে মার্চে আটকে থাকা বা বিলম্বিত চালানগুলো এপ্রিল মাসে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে এপ্রিলের রপ্তানি আয় বেড়েছে। তাই এই প্রবৃদ্ধিকে পুরোপুরি নতুন ক্রয়াদেশ বা নতুন বাজার চাহিদার প্রতিফলন বলা ঠিক হবে না। ব্যবসায়ীদের মতে, কারখানায় অতিরিক্ত ক্রয়াদেশ আসেনি, নতুন ক্রেতার চাপও তেমন বাড়েনি।
এখানেই রপ্তানি খাতের বাস্তব চিত্র বোঝা জরুরি। একদিকে এপ্রিলের পরিসংখ্যান বড় সাফল্যের বার্তা দেয়। অন্যদিকে এই উত্থানের একটি অংশ এসেছে আগের মাসের বিলম্বিত রপ্তানি থেকে। তাই মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি দেখে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি এই পুনরুদ্ধারকে অগ্রাহ্য করাও ঠিক হবে না।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু মনে করেন, বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও সরকারের নীতিগত সহায়তা রপ্তানি খাতকে ইতিবাচক ধারায় রাখতে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সরকারের ঋণ সহায়তা অনেক কারখানাকে উৎপাদন চালু রাখতে সহায়তা করেছে। এর ফলে রপ্তানি প্রবাহ পুরোপুরি থেমে যায়নি।
শাশা গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন ও বিভিন্ন ছুটির কারণে পর্যাপ্ত কার্যদিবস পাওয়া যায়নি। এরপর মার্চে ঈদের দীর্ঘ ছুটি ছিল। ফলে উৎপাদনাধীন অনেক ক্রয়াদেশ নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি করা যায়নি। এসব পণ্য এপ্রিল মাসে রপ্তানি হওয়ায় আয় এক লাফে বেড়েছে।
এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, এপ্রিলের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পেছনে দুটি দিক কাজ করেছে। প্রথমত, বৈশ্বিক বাজারে কিছুটা চাহিদা ফিরে আসার ইঙ্গিত আছে। দ্বিতীয়ত, আগের মাসের বিলম্বিত চালান এপ্রিল মাসে যুক্ত হওয়ায় পরিসংখ্যান বড় দেখাচ্ছে। তাই এপ্রিলের সাফল্যকে ইতিবাচক বলা যায়, তবে এটিকে স্থায়ী ঘুরে দাঁড়ানো হিসেবে দেখার আগে আরও সময় প্রয়োজন।
রপ্তানি খাতের সামনে এখন কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যা, শ্রমিক মজুরি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা এবং ক্রেতাদের কম দামে পণ্য নেওয়ার প্রবণতা এখনো বড় বাধা। এর সঙ্গে বড় ছুটি বা রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হলে উৎপাদন ও রপ্তানির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।
মোহাম্মদ হাতেমের মতে, রপ্তানির প্রকৃত ও স্থিতিশীল চিত্র বোঝার জন্য অন্তত জুলাই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। কারণ ঈদ-পরবর্তী প্রভাব জুন মাসেও দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে আরেকটি বড় ছুটি থাকায় উৎপাদন ও রপ্তানি আবারও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পরবর্তী মাসের হিসাবেও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে এপ্রিল ২০২৬ বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক মাস। আট মাসের নিম্নমুখী প্রবণতার পর এমন প্রবৃদ্ধি ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক ও শ্রমঘন শিল্পের জন্য স্বস্তির বার্তা বহন করে। তবে এই উত্থান কতটা প্রকৃত চাহিদানির্ভর এবং কতটা বিলম্বিত চালানের ফল, সেটি বোঝাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প বারবার প্রমাণ করেছে, প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তার আছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু মাসিক প্রবৃদ্ধি নয়, ধারাবাহিক ক্রয়াদেশ, উৎপাদন সক্ষমতা, বাজার বহুমুখীকরণ, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং নীতিগত সহায়তার ওপরও জোর দিতে হবে।
এপ্রিলের বড় প্রবৃদ্ধি তাই একদিকে আশার আলো, অন্যদিকে সতর্ক বার্তাও। কারণ পরিসংখ্যান ভালো হলেও তার ভেতরের কারণ বিশ্লেষণ না করলে প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় না। আগামী কয়েক মাসের রপ্তানি চিত্রই বলে দেবে, বাংলাদেশ সত্যিই রপ্তানি খাতে নতুন গতিতে ফিরেছে, নাকি এপ্রিলের উত্থান ছিল সাময়িক চাপ কাটানোর ফল।

