বাংলাদেশের সুকুক কর্মসূচি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে যাত্রা শুরু করার সময় এটিকে ইসলামী অর্থায়নের এক নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখা হয়েছিল।
সম্ভাবনার সঙ্গে সতর্কতার বার্তা: বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই- জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের মোট নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৬ কোটি টাকা, যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল অনেক কম। ব্যাংক খাত থেকেই ঋণ নেয়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৯২৩ দশমিক ৬ কোটি টাকা। এ প্রেক্ষাপটে সুকুকের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুকের (বিজিআইএস) পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে এবং এটি এখন সরকারি ঋণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে। ফলে সুকুক আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই। এটি এখন সরকারি ঋণ কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে সুকুকের দুই ভিন্ন রূপ। একদিকে রয়েছে রেভিনিউ সুকুক, যেখানে নির্দিষ্ট প্রকল্পের বিপরীতে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে টোল রোড, বিদ্যুৎ প্রকল্প বা পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কথা বলা যায়। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা প্রকল্প থেকে উৎপন্ন আয়ের অংশীদার হয়। অর্থাৎ, এখানে সুকুক কেবল অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম নয়, এটি সরাসরি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে রয়েছে জেনারেল-পারপাজ সুকুক, যেখানে বিদ্যমান সম্পদের বিপরীতে অর্থ সংগ্রহ করে তা সরকারের সাধারণ খাতে ব্যয় করা হয়। এখানে প্রকল্পভিত্তিক আয়ের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক থাকে না। বাস্তবে এটি অনেকটাই প্রচলিত বন্ডের মতো আচরণ করে। পার্থক্যটি কেবল কারিগরি নয়। এটি সুকুকের দর্শন ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: ধীরে ধীরে পথ পরিবর্তন
বাংলাদেশের প্রথম দিকের সুকুক ইস্যুগুলো ছিল আশাব্যঞ্জক। নিরাপদ পানি সরবরাহ, প্রাথমিক শিক্ষা ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মতো প্রকল্পে অর্থায়নে সুকুক ব্যবহার করা হয়েছিল। এগুলো ছিল প্রকৃত অর্থে রেভিনিউ-বেজড ফাইন্যান্সিং। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রবণতা বদলাচ্ছে। নতুন ‘স্পেশাল সুকুক-১’ ও অন্যান্য ইস্যুতে বিদ্যমান সরকারি সম্পদ যেমন আবাসন বা রেলওয়ে অবকাঠামো ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখানে নতুন উৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে না; বরং পুরনো সম্পদের বিপরীতে নতুন ঋণ নেয়া হচ্ছে। ফলে সুকুকের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে উন্নয়ন অর্থায়ন থেকে সাধারণ ঋণ ব্যবস্থায় রূপান্তর।
ঋণ অর্থনীতিতে সুকুকের বাড়তি ভূমিকা: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই সরকার প্রায় ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ নিয়েছে। এ ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন সুকুকের মাধ্যমে সংগৃহীত হচ্ছে। এখানে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—
প্রথমত, সুকুক এখন আর বিকল্প নয়। এটি মূলধারার অর্থায়ন মাধ্যম হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয়ত, বাজারটি অত্যন্ত ব্যাংকনির্ভর। ইসলামী ব্যাংকগুলোই প্রায় পুরো ইস্যু শোষণ করছে, ফলে প্রকৃত বাজারভিত্তিক মূল্যনির্ধারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তৃতীয়ত, সুকুকের রিটার্ন নির্ধারণে প্রকল্পের আয়ের চেয়ে প্রচলিত সুদহারই বেশি প্রভাব ফেলছে।
ফলে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সুকুক কাঠামোগতভাবে ইসলামী, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে প্রচলিত বন্ডের মতো।
শারিয়াহ প্রশ্ন: ফর্ম নাকি বাস্তবতা?
সুকুকের মূল প্রতিশ্রুতি হলো এটি সুদভিত্তিক নয়, বরং বাস্তব সম্পদের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু যখন একই রাষ্ট্র সব পক্ষ উদ্যোক্তা, মালিক, গ্যারান্টর হিসেবে কাজ করে, তখন বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত ঝুঁকি কতটা রয়েছে, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। এছাড়া যদি আয় প্রকল্প থেকে না এসে সাধারণ বাজেট থেকে আসে, তাহলে এটি কি সত্যিই ইসলামী অর্থায়ন, নাকি কেবল একটি ‘ইসলামী লেবেল’? এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া গেলে সুকুকের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে যা শিখতে পারি: মালয়েশিয়া সুকুক বাজারে নেতৃত্ব দিয়েছে মূলত শক্তিশালী শারিয়াহ গভর্ন্যান্স ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে। সেখানে সুকুক কেবল ঋণ নয়। এটি উন্নয়ন অর্থায়নের একটি সুসংগঠিত মাধ্যম। ইন্দোনেশিয়া দেখিয়েছে কীভাবে সুকুককে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। তাদের ‘গ্রিন সুকুক’ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে কিছু দেশ সাধারণ তহবিলভিত্তিক সুকুক ইস্যুর দিকে ঝুঁকছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুকুকের মৌলিক চরিত্রকে দুর্বল করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে পথ কোনটি? বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সহজ পথ রয়েছে সুকুককে সাধারণ ঋণের একটি নতুন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। অন্যদিকে কঠিন কিন্তু সঠিক পথ রয়েছে সুকুককে প্রকৃত উন্নয়ন অর্থায়নের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা।
সংস্কারের জন্য প্রস্তাব: বাংলাদেশের সুকুক বাজারকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ জরুরি:
প্রকৃত সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা: প্রতিটি সুকুক নতুন বা আয়-উৎপাদনকারী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।
স্বাধীন শারিয়াহ তদারকি কাঠামো গঠন: পুঁজিবাজারে আলাদা, আইনি ক্ষমতাসম্পন্ন শারিয়াহ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
গ্রিন ও সামাজিক সুকুক চালু করা: নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে সুকুক ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
বিনিয়োগকারীর ভিত্তি সম্প্রসারণ: ব্যাংকের বাইরে পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি, সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
কর সুবিধা নিশ্চিত করা: সুকুক ও প্রচলিত বন্ডের মধ্যে কর ব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে।
সেকেন্ডারি মার্কেট উন্নয়ন: সুকুকের জন্য সক্রিয় বাজার তৈরি করলে তার তারল্য বাড়বে।
প্রকল্পের আয় ও পরিশোধকে সাধারণ বাজেট থেকে আলাদা রাখতে হবে—যাকে বলা হয় রিং-ফেনসিং।
ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা: বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখন ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অধীনে। ফলে সুকুকের মাধ্যমে এ চাহিদাকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব। তবে যদি সুকুক কেবল প্রচলিত ঋণের বিকল্প নাম হয়ে যায়, যেখানে কাঠামো ইসলামী কিন্তু বাস্তবতা প্রচলিত, তাহলে এটি তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই সরকার যে ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, এ ঋণের প্রতিটি টাকার বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বহন করবে। তাই অন্তত সুকুকের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে এটি যেন প্রকৃত সম্পদভিত্তিক, শরিয়াহসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল হয়। বাংলাদেশের সুকুক বাজার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সঠিক নীতি ও সংস্কার এটিকে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি আদর্শ মডেলে পরিণত করতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল সরকারি ঋণের আরেকটি রূপ হিসেবেই থেকে যাবে।
এম কবির হাসান: নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার; এএওআইএফআইয়ের নৈতিকতা ও গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য

