আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ঘিরে সরকারের অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়ে উঠছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার খাতে। প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশই যাচ্ছে এই তিন খাতে। নীতিনির্ধারকদের ভাষায়, এটি নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রসরতা। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এই বিশাল বরাদ্দ বাস্তবে কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার ৩০৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। স্থানীয় সরকার বিভাগে থাকছে ৩৬ হাজার ২২৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ২৫২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এই তিন খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ২১ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় ৪০.৪৩ শতাংশ। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং সেবাখাতকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতেই এই বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
তবে বরাদ্দের ভেতরের কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—দুই খাতেই অনুমোদিত প্রকল্পের তুলনায় অননুমোদিত প্রকল্পে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে। শিক্ষা খাতে অনুমোদিত প্রকল্পে বরাদ্দ ১৭ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা হলেও অননুমোদিত প্রকল্পে বরাদ্দ ৩০ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতে অনুমোদিত প্রকল্পে ৭ হাজার ৬৫২ কোটি টাকার বিপরীতে অননুমোদিত প্রকল্পে বরাদ্দ ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার বিভাগে তুলনামূলক ভারসাম্য থাকলেও সেখানে অননুমোদিত অংশ পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়।
এই কাঠামো উন্নয়ন ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় পরিমাণ অননুমোদিত প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ থাকলে বাস্তবায়ন ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেট প্রণয়নে আরও সংযম ও বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নীতিনির্ধারণের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
একই ধরনের মত দিয়েছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি। তিনি বলেন, বাজেটের আকার বড় হওয়া নয়, বরং কার্যকর প্রকল্প নির্বাচন এবং বাস্তবায়নই মূল বিষয়। তা না হলে অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
বাস্তব চিত্রও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম। অনেক মন্ত্রণালয় এখনো তাদের বরাদ্দের ১০ শতাংশও ব্যয় করতে পারেনি। ফলে কাগজে বরাদ্দ বড় হলেও বাস্তব ব্যয়ে তার প্রতিফলন কম—এমন সমালোচনা জোরালো হচ্ছে। অন্যদিকে বাজেটের একটি বড় অংশ থোক বরাদ্দ এবং অননুমোদিত প্রকল্পে রাখা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে প্রকৃত উন্নয়ন অগ্রগতি মূল্যায়ন কঠিন হয় এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা-বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এটি জনগণের সরকার হওয়ায় মানুষের চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণে বড় বাজেটের প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, উন্নয়ন ব্যয়ের পরিধি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্র করে বড় উন্নয়ন বরাদ্দের পরিকল্পনা সরকারের অগ্রাধিকারকে স্পষ্ট করলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা, প্রকল্পের গুণগত মান এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে—এই বিশাল বাজেট বাস্তবে কতটা কার্যকর ফল দিতে পারবে।

