বর্তমান জ্বালানি সংকট আবারও সামনে এনেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা। বাস্তবতা বলছে, বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো কাঠামোগত প্রস্তুতি দেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। অতীতের অভিজ্ঞতা থাকলেও তা থেকে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা নেওয়ার প্রবণতা দুর্বল।
অর্থনীতিতে ধাক্কা আসা স্বাভাবিক হলেও মূল প্রশ্ন হচ্ছে—সরকার কতটা প্রস্তুত থাকে এসব পরিস্থিতি মোকাবেলায়, এবং সংকট কাটিয়ে উঠার পর কতটা টেকসই নীতি গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে, সংকট দেখা দিলে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যত থেমে যায়। এর ফলে নতুন সংকটে দুর্বলতা আবারও প্রকাশ পায়।
এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। করোনা মহামারি এবং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে সেই সময়েও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি।
এর ফলাফল হিসেবে মূল্যস্ফীতি দুই অংকে পৌঁছে যায় এবং এখনো তা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যায় এবং স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটে। সতর্ক সংকেত থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্য এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর যথাযথভাবে এগোয়নি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তান ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪৬ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করেছে। তুলনায় বাংলাদেশ এখনো উল্লেখযোগ্য রূপান্তর অর্জন করতে পারেনি। ফলে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলায় দেশের সক্ষমতা সীমিত রয়ে গেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনাও জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাবে শিল্প উৎপাদন কমছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং গ্যাস সংকটে সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে লোডশেডিং বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ভর্তুকির চাপ রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ ফেলছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি এখন কৌশলগত সম্পদ হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে অর্থায়নের ঘাটতি। গত দুই দশকে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশে সীমিত রয়েছে।
বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত সমস্যা। এর মধ্যে রয়েছে মুদ্রার অস্থিতিশীলতা, নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন, প্রকল্প ঝুঁকি, প্রযুক্তিগত অনিশ্চয়তা, নিম্ন সার্বভৌম রেটিং, জটিল ঋণ প্রক্রিয়া, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং নির্ভরযোগ্য গ্যারান্টির অভাব। এসব কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও বড় প্রকল্পে ঝুঁকি নিতে পিছিয়ে যাচ্ছেন।
একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৯৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। আগামী দশকে এই চাহিদা বেড়ে ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ বর্তমানে বিনিয়োগ রয়েছে মাত্র ২৩৮ মিলিয়ন ডলার। ফলে লক্ষ্য পূরণে কয়েকগুণ বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন কর্মসূচি ১০ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত হলেও বড় প্রকল্পের জন্য তা যথেষ্ট নয়। ছোট সৌর প্রকল্পগুলোও উচ্চ জামানতের কারণে ঋণ পেতে সমস্যায় পড়ে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব প্রকল্পকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে।
ইডকল নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের অর্থায়ন প্রক্রিয়া তুলনামূলক কঠোর। উচ্চ জামানত, অতিরিক্ত তথ্য যাচাই এবং সরঞ্জাম সরবরাহের শর্ত অনেক প্রতিষ্ঠানকে নিরুৎসাহিত করছে। অন্যদিকে দরপত্র ব্যবস্থায় কঠোর শর্ত দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা জামানতই কোটি টাকার ঘরে পৌঁছে যায়, যা ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বহন করা কঠিন।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়নে বৈষম্যের মুখে পড়ছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি অংশীদারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়ন কাঠামো সংস্কার এখন সময়ের দাবি। পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা বাড়ানো, ইডকলের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ক্ষুদ্র প্রকল্পের জন্য বিশেষায়িত অর্থায়ন চালু করা জরুরি।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সৌর সেচসহ ছোট প্রকল্পগুলোকে সহজ অর্থায়নের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সবুজ অর্থায়ন তহবিল ও ঝুঁকি গ্যারান্টি স্কিম চালু করা গেলে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌর, বায়োমাস, জলবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তির মতো খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে ফিড-ইন ট্যারিফ নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

