বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এখন বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলওর) এক নতুন জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ গত তিন বছরে কোনো ধরনের কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণ পাননি। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হওয়ার পরও বড় একটি অংশ দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
জরিপে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন তাদের কাজ আরও ভালোভাবে করতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেই প্রয়োজন অনুযায়ী সুযোগ না থাকায় অনেকেই পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। এই সমস্যা শুধু আনুষ্ঠানিক খাতেই নয়, অনানুষ্ঠানিক খাতেও দেখা যাচ্ছে।
‘আগামীর জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষা ও দক্ষতা’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা ও কর্মজীবনের দক্ষতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না পেলে ব্যক্তিগত কর্মজীবনের ক্ষতির পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাও কমে যায়।
আইএলও সতর্ক করে বলেছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক জীবনব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে না তুললে ডিজিটাল পরিবর্তন, সবুজ অর্থনীতি ও জনমিতিক রূপান্তরের ফলে বৈষম্য আরও বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে জীবনব্যাপী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে জাতীয় নীতির অগ্রাধিকার হিসেবে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে মোট ১৭৪টি গবেষণার পর্যালোচনার ভিত্তিতে। এতে কর্মী জরিপ, অনলাইন চাকরির চাহিদা বিশ্লেষণ, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এবং প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই জরিপ পরিচালিত হয় ২০২৩ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে। এতে দেশের ৬ হাজার ১৬৪টি পরিবার থেকে একজন করে প্রতিনিধি সাক্ষাৎকারে অংশ নেন।
জরিপ অনুযায়ী, ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন তারা গত তিন বছরে কোনো কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণ পাননি। তাদের মধ্যে ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ বলেছেন, কাজের দক্ষতা বাড়াতে তাদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল। খাতভিত্তিক চিত্রেও বড় বৈষম্য দেখা গেছে। আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরতদের ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক শেখার সুযোগ পান। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতে এই হার মাত্র ২৪ শতাংশ।
পেশাগত অবস্থান অনুযায়ী ব্যবধান আরও স্পষ্ট। ব্যবস্থাপক ও পেশাজীবীদের ৫৭ শতাংশ জানিয়েছেন তারা সুপারভাইজার বা সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পান। সাধারণ বা প্রাথমিক পেশায় নিয়োজিতদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৯ শতাংশে নেমে এসেছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন ব্যক্তিদের এক-চতুর্থাংশের বেশি কর্মক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক শেখার সুযোগ পান। তবে যাদের শিক্ষা নিম্ন মাধ্যমিকের নিচে, তাদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩ শতাংশ।
আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, বর্তমান শ্রমবাজারে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, সফট স্কিলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা জরুরি।

