রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ওসমানী উদ্যান এখনো ঘিরে আছে টিনের বেড়া দিয়ে। ২০১৬ সাল থেকে এই অবস্থা চললেও উদ্যানটি এখনও জনসাধারণের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। শুধু ওসমানী উদ্যান নয়, ধানমন্ডি লেক, পান্থকুঞ্জ পার্ক, ধুপখোলায় শিশুপার্কসহ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একাধিক উন্নয়ন কাজও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে একই প্রকল্পের অধীনে।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারি ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। লক্ষ্য ছিল সড়ক, ফুটপাত, যাত্রী ছাউনি, ফুটওভার ব্রিজ, পুলিশ বক্স, সড়কবাতি, আধুনিক কসাইখানা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্টেশন, কবরস্থান, খেলার মাঠসহ নগর অবকাঠামোর উন্নয়ন।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত। ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২০২ কোটি টাকা, যার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অংশ ৩৬০ কোটি টাকা এবং সরকারি কোষাগার থেকে ৮৪২ কোটি টাকা। কাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেষ হয়নি।
পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি পাঁচবার সংশোধন করা হয়। প্রথম সংশোধনে ব্যয় বাড়ে ১২ কোটি টাকা, ফলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয় আরও ৫১৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭১৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। এতে সরকারি কোষাগারের অংশ দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। একই সঙ্গে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর তিন দফায় মেয়াদ বাড়ানো হলেও নতুন করে ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পটি টানা রাখা হয়। সর্বশেষ মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে।
নথি অনুযায়ী, প্রায় ৯ বছরে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৯ শতাংশ। ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। তবে বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ওসমানী উদ্যান এখনো টিনের বেড়ায় ঘেরা। পান্থকুঞ্জ পার্ক এখনো সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত হয়নি। এর ভেতর দিয়ে চলছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ। ফলে প্রকল্পের একাধিক অংশ থমকে আছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ স্থগিত হয়ে যায়। এতে কাজের গতি আরও কমে যায়। পরে দেড় বছর পর সম্প্রতি বিল পরিশোধ ও বকেয়া নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ আবার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) এডিপিতে এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ১ লাখ টাকা, যা প্রকল্পটিকে নামমাত্রভাবে সক্রিয় রাখার সমান বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এখনো প্রায় ২১ শতাংশ কাজ বাকি। কিন্তু নতুন নির্দেশনায় মাত্র দুই মাস সময় রেখে কাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে। এতে বাস্তবায়ন সম্ভব কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে প্রকল্পটির কোনো প্রকল্প পরিচালক নেই। প্রথম পরিচালক অপসারিত হন, দ্বিতীয়জন মারা যান। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন পরিচালকও নিয়োগ হয়নি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি আদেশ জারি হলে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তখন বকেয়া পরিশোধসহ বাকি কাজ সম্পন্ন করা হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের খরচ বাড়ে, নাগরিক সেবা ব্যাহত হয় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটে। তার মতে, রাজধানীর এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বহুবার সংশোধনের পরও শেষ না হওয়া উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “২ মাসে ২১ শতাংশ কাজ শেষ করা বাস্তবে কঠিন। প্রকল্প প্রণয়ন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি।”
দীর্ঘ সময়, একাধিক সংশোধন এবং প্রশাসনিক জটিলতার পরও রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প এখন শেষ পর্যায়ে এসে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে কি না—তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন।

