বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজার এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সবুজ অর্থনীতির দিকে অগ্রযাত্রা এবং জনমিতিক পরিবর্তন—সব মিলিয়ে কাজের ধরন ও চাহিদায় বড় রূপান্তর ঘটছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় টিকে থাকতে এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণকে অপরিহার্য বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। বাংলাদেশের অন্তত ৪৮ শতাংশ কর্মউপযোগী মানুষের জন্য এই ধরনের প্রশিক্ষণ জরুরি বলে উঠে এসেছে সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।
গতকাল মঙ্গলবার (৫ মে) প্রকাশিত ‘লাইফলং লার্নিং অ্যান্ড স্কিলস ফর দ্য ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এটি প্রস্তুত করা হয়েছে কর্মী জরিপ, অনলাইন চাকরির চাহিদা বিশ্লেষণ, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এবং প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা নিয়ে করা ১৭৪টি গবেষণার পর্যালোচনার ভিত্তিতে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে চলমান বৈশ্বিক পরিবর্তন বিভিন্ন দেশ এবং দেশের অভ্যন্তরে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এ অবস্থায় জীবনব্যাপী শিক্ষাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনার জন্য সরকারগুলোর প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে আইএলও।
সংস্থাটির জরিপে অংশ নেওয়া বাংলাদেশিদের প্রায় অর্ধেক (৪৮ শতাংশ) জানিয়েছেন, তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ, যা নতুন প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের অর্ধেকেরও বেশি ডিজিটাল ও কম্পিউটার দক্ষতায় স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ চান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএলওর মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হংবো বলেন, জীবনব্যাপী শিক্ষা বর্তমান কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি করে। তাঁর মতে, এটি শুধু উৎপাদনশীলতা বা চাকরির সুযোগই বাড়ায় না, বরং ভালো কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করে, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এবং একটি স্থিতিশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাধ্যমিক শিক্ষাসম্পন্ন কর্মক্ষম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশ কোনো না কোনো ধরনের শেখার কার্যক্রমে—আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে—অংশ নেন। অন্যদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা নেই এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এই হার মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
এছাড়া আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের মধ্যেও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। যেসব পেশায় উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন বেশি—যেমন ব্যবস্থাপক, পেশাজীবী ও প্রযুক্তিবিদ—সেসব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বিপরীতে প্রাথমিক পর্যায়ের পেশাগুলোর ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ (৭২ শতাংশ) উত্তরদাতা জানিয়েছেন, শিক্ষানবিশ বা ইন্টার্নশিপে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তাদের কাজের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সব মিলিয়ে আইএলওর এই প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু শিক্ষা নয়, বরং ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়নই হবে মূল চাবিকাঠি।
পরিবর্তিত শ্রমবাজারে কোন প্রশিক্ষণ সবচেয়ে জরুরি:
বিশ্ব ও দেশের শ্রমবাজারে দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে বাংলাদেশের কর্মীরা নানা ধরনের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন অনুভব করছেন। আইএলওর জরিপে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণের, যা নতুন দক্ষতা অর্জনে সহায়ক।
জরিপ অনুযায়ী, নতুন কারিগরি দক্ষতা শেখার জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণকে প্রয়োজন বলে মনে করেন ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। এই চাহিদা তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং প্রবীণদের মধ্যে ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ এই প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
এরপরই রয়েছে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রাথমিক কারিগরি প্রশিক্ষণ। সামগ্রিকভাবে ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ এটিকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই চাহিদা ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ, প্রবীণদের মধ্যে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং তরুণদের মধ্যে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ।
ব্যক্তিগত উন্নয়ন ও মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণের প্রয়োজন জানিয়েছেন ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। এই হার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৩২ শতাংশ এবং প্রবীণদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও তরুণদের মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে কম, ২১ দশমিক ৩ শতাংশ।
ডিজিটাল ও কম্পিউটার দক্ষতার ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও স্পষ্টভাবে বিভক্ত। সামগ্রিকভাবে ২৮ শতাংশ মানুষ এই প্রশিক্ষণকে প্রয়োজনীয় মনে করেন। তবে তরুণদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি, ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং প্রবীণদের মধ্যে মাত্র ৫ দশমিক ১ শতাংশ।
ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন জানিয়েছেন ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। তরুণদের মধ্যে এটি ২১ শতাংশ, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং প্রবীণদের মধ্যে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। যোগাযোগ, সহযোগিতা ও দলগত কাজের দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজন উল্লেখ করেছেন ৯ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। এই হার তরুণদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রবীণদের মধ্যে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
স্ব-সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা উন্নয়নের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম, ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে প্রবীণদের মধ্যে এটি কিছুটা বেশি, ১০ দশমিক ২ শতাংশ। তরুণদের মধ্যে ৮ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। সবচেয়ে কম চাহিদা দেখা গেছে সৃজনশীলতা, কৌশলগত চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধান দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে, যা ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। তরুণদের মধ্যে এটি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং প্রবীণদের মধ্যে ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের কর্মীদের প্রধান অগ্রাধিকার এখন স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি, আর বয়স্কদের মধ্যে প্রাথমিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে বেশি।
দক্ষতার পরিবর্তিত চাহিদা ও বৈষম্য বাড়ছে শ্রমবাজারে:
দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব শ্রমবাজারে দক্ষতার চাহিদাও সমান গতিতে বদলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কাজের ধরনকে নতুনভাবে গড়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে সবুজ অর্থনীতির প্রসার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে এবং জনসংখ্যার বার্ধক্য সেবা খাতে বাড়তি চাহিদা তৈরি করছে। তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও প্রশিক্ষণ ও শেখার সুযোগে বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ গত এক বছরে কোনো কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতে স্থায়ী পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যে এই সুযোগ পেয়েছেন ৫১ শতাংশ। এই পার্থক্য শ্রমবাজারে শেখার সুযোগের স্পষ্ট বৈষম্যকে সামনে এনেছে।
স্বল্প শিক্ষিত এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ব্যক্তিরা সাধারণত কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করেন। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে আনুষ্ঠানিক খাতে থাকা কর্মীরা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ এবং সহকর্মীদের সহযোগিতায় শেখার সুযোগ পান। এতে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সুযোগে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে এমন একটি শিক্ষা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে, যা পুরো কর্মজীবনজুড়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশে আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, বৈশ্বিক প্রবণতাগুলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাঁর মতে, বর্তমান শ্রমবাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সফট স্কিল বা ব্যক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা যায়।

