মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে চলতি বছরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়তে পারে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে।
এডিবির প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে তেলের দাম কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারে নামতে পারে। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের গড় দাম ছিল প্রায় ৬৯ ডলার। ‘দ্য মিডল ইস্ট কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি এডিবির ৫৯তম বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপন করেন সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ আলবার্ট এফ পার্ক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও জ্বালানি পরিবহন এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে তেল ছাড়াও ইউরিয়া সারসহ বিভিন্ন নন-অয়েল পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন অব্যাহত থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে সতর্ক করেছে এডিবি। সংস্থাটির মতে, এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
এডিবির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির সরবরাহ সক্ষমতার প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের রাশ লাফান শিল্প নগরী এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি স্থাপনাগুলো পুরোপুরি সচল করতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক তেল পরিশোধন অবকাঠামোর প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং তেল উৎপাদন সক্ষমতার ২ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর কিছু মেরামতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ পরিস্থিতির প্রভাবে ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জিডিপি প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। আলবার্ট পার্ক বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন এখনো গুরুতরভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তার মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ক্ষতি সংঘাত শেষ হওয়ার পরও বহু বছর ধরে সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এডিবি জানিয়েছে, সব দেশের ওপর প্রভাব একরকম হবে না। তবে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে। সংস্থাটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে নামিয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চলটির মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলেও ধারণা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়া তাদের মোট সারের প্রায় ৩৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। বিশেষ করে বাংলাদেশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বড় পরিমাণ সার আমদানি করে থাকে। ফলে ইউরিয়ার দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। আলবার্ট পার্ক সতর্ক করে বলেন, খাদ্যদ্রব্যের দামে এ ধরনের চাপ সাধারণত খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

